একজন বিশ্বাসী মুমিনের ইহকালীন সাধনা এবং পরকালীন সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো রাব্বুল আলামীনের ভালোবাসা ও নৈকট্য (কুরবত) হাসিল করা। মানুষ দুনিয়ার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য কত আয়োজন ও চাটুকারিতা করে; অথচ নিখিল বিশ্বের মালিক মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে অত্যন্ত সহজ শর্তে তাঁর সবচেয়ে আপন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আল্লাহর নৈকট্য কোনো কাল্পনিক ধারণা বা মনগড়া পন্থার নাম নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে বাস্তব জীবনের পরিবর্তন ও সুনির্দিষ্ট আমল। আসুন জেনে নিই সেই চিরন্তন ও পরীক্ষিত পথগুলো, যা একজন সাধারণ বান্দাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুমিনদের প্রতি সরাসরি নির্দেশ জারি করেছেন তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য পাওয়ার উপায় বা পথ অন্বেষণ করার জন্য:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর নৈকট্য (ওয়াসীলা) অন্বেষণ করো এবং তাঁর পথে চেষ্টা-সংগ্রাম করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩৫
প্রখ্যাত মুফাসসির হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.) হযরত কাতাদাহ ও মুজাহিদ (রহ.) হতে বর্ণনা করে উল্লেখ করেছেন যে, আয়াতে ‘ওয়াসীলা’ বলতে বোঝানো হয়েছে—“এমন নেক আমল যার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য করা হয় এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা যায়।” অর্থাৎ আল্লাহর সন্তোষমূলক খাঁটি আমলই হলো তাঁর নৈকট্য অর্জনের একমাত্র মাধ্যম।
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রামাণ্য নীতি বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদিসে কুদসিতে (হাদিসুল ওয়ালিয়্যা):
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর (প্রিয় বান্দার) সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিই। আর আমার বান্দা এমন কোনো আমল দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না, যা আমার কাছে ওই বিষয়ের চেয়ে অধিক প্রিয়—যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। অতঃপর বান্দা অবিরাম নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৫০২
এই মহান হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রথম ভিত্তি হলো তাঁর ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা। এরপর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এভাবে ফরজ ও নফল আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়।
কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক গবেষণায় দেখা যায়, নিচের আমলগুলো বান্দাকে খুব দ্রুত আল্লাহর খাস সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়:
“বান্দা যখন সিজদারত থাকে, তখন সে তার রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। কাজেই তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২
“আমাদের রব, বরকতময় ও সর্বোচ্চ, প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন: ‘কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৪৫
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বান্দার জন্য দোয়া, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন চাওয়া এবং গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ একটি সময়। তাই সম্ভব হলে এই সময়ে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করে আন্তরিকভাবে দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত।
নেক আমল করার পাশাপাশি যেসব বিষয় বান্দাকে আল্লাহর রহমত ও নৈকট্য থেকে বহুদূরে নিক্ষেপ করে, সেগুলো থেকে আত্মরক্ষা করা ফরজ:
আল্লাহর নৈকট্য লাভ কোনো দূরপাল্লার অসম্ভব স্বপ্ন নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন কেবল একটি খাঁটি অনুতপ্ত হৃদয় ও অবিচল ইচ্ছা। হাদিসে কুদসিতে নবীজি ﷺ বলেছেন, “বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই; সে যখন আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” (সহীহ বুখারী: ৭৫৩৬)।
সুতরাং গাফলতির ঘুম ভেঙে আজ থেকেই ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নবান হই এবং ছোট ছোট নফল আমল ও সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় সান্নিধ্য অর্জনের পথে পা বাড়াই। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর খাঁটি ওলীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমীন।
উত্তর: ফরজ ইবাদত বাদ দিয়ে নফল আমলকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিকল্প বানানো যায় না। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, বান্দা তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করে, আর তা হলো তিনি যে ফরজ বিধানগুলো বান্দার ওপর নির্ধারণ করেছেন। এরপর নফল আমলের মাধ্যমে বান্দা আরও নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। (সহীহ বুখারী: ৬৫০২)
উত্তর: সিজদা হলো একজন মানুষের চরম বিনয় ও দাসত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ। বান্দা যখন তার সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ কপাল ও নাক মাটিতে লুটিয়ে দেয়, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। সহীহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, এ সময় বেশি বেশি দোয়া করার নির্দেশ রয়েছে।
উত্তর: মুফাসসিরিনে কেরামের সর্বসম্মত মতে, এই আয়াতে 'ওয়াসীলা' অর্থ হলো এমন নেক আমল বা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম (যেমন সালাত, সিয়াম, আনুগত্য ও দান), যার দ্বারা মহান আল্লাহর নৈকট্য ও করুণা অন্বেষণ করা হয়।
আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের এই বরকতময় গাইডলাইনটি আপনার পরিবার ও প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।