দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কোথাও যাওয়ার পথে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে অনেককেই চরম বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। কেউ কেউ ক্ষোভের বশে বলে বসেন—‘এখনই বৃষ্টি হওয়ার সময় পেল!’ কিংবা আবহাওয়া ও বৃষ্টিকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ পর্যন্ত করেন। অথচ একজন মুমিনের ঈমান ও আকিদার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও মারাত্মক গুনাহের কাজ। বৃষ্টি কোনো অন্ধ প্রাকৃতিক শক্তির কাজ নয়, বরং তা সরাসরি নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহর নির্দেশে অবতীর্ণ হয়। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বৃষ্টি বর্ষণের তাৎপর্য, বিরক্তি প্রকাশের ধর্মীয় বিধান এবং বৃষ্টির সময়ে আমাদের করণীয় সুন্নাহসমূহ জেনে নেওয়া যাক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বৃষ্টিকে তাঁর অসীম অনুগ্রহ ও ‘রহমত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বৃষ্টির মাধ্যমেই আল্লাহ শুষ্ক ও মৃত মাটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন, ফসল ফলান এবং সমগ্র জীবজগতের পানীয়ের সংস্থান করেন।
وَهُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ الْغَيْثَ مِن بَعْدِ مَا قَنَطُوا وَيَنشُرُ رَحْمَتَهُ ۚ وَهُوَ الْوَلِيُّ الْحَمِيدُ
“আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষের নিরাশ হয়ে পড়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন; আর তিনিই তো প্রকৃত অভিভাবক, সর্বপ্রশংসিত।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ২৮
মানুষ কেবল তার তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা ভেবে অকৃতজ্ঞ আচরণ করে, অথচ এই বৃষ্টির ওপর কোটি কোটি মানুষ, বনের পশুপাখি, কীটপতঙ্গ এবং জলজ পরিবেশের অস্তিত্ব নির্ভর করে।
মেঘমালা পরিচালিত হয় বাতাসের সাহায্যে এবং বৃষ্টি বর্ষিত হয় আল্লাহর হুকুমে। প্রকৃতি বা বাতাসকে অভিশাপ দেওয়াকে রাসূলুল্লাহ ﷺ সরাসরি নিষেধ করেছেন।
উবাই ইবনে কাব (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“তোমরা বাতাসকে গালি দিও না। যখন তোমরা এমন কিছু দেখ যা তোমাদের অপছন্দ হয়, তখন বলো: ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে এই বাতাসের কল্যাণ, এর ভেতরের কল্যাণ এবং যার আদেশ দিয়ে একে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আমরা আপনার কাছে আশ্রয় চাই এই বাতাসের অনিষ্ট থেকে, এর ভেতরের অনিষ্ট থেকে এবং যার আদেশ দিয়ে একে পাঠানো হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে।’”
— জামে তিরমিযী, হাদিস: ২২৫২ (হাসান সহীহ)
বাতাস কিংবা বৃষ্টির নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা ক্ষমতা নেই; তারা আল্লাহর অনুগত সৃষ্টি মাত্র। তাই তাদের অভিশাপ দেওয়া মানে সরাসরি আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রদর্শন করা।
অনেকে অবচেতনভাবেই বলে থাকেন—‘আজকের দিনটাই খারাপ’, ‘আবহাওয়াটা অপয়া’ কিংবা ‘বৃষ্টি এসে সব মাটি করে দিল’। হাদিসে কুদসিতে এই জাতীয় আচরণকে সরাসরি আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেওয়ার সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“বনি আদম যুগ বা সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়; অথচ আমিই যুগের পরিচালক। আমার হাতেই সব কর্তৃত্ব, আমিই রাত ও দিনের আবর্তন ঘটাই।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৪৬৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৪৬
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, জাহেলি যুগের মানুষ যে কোনো বিপদ বা কষ্টের জন্য যুগ বা সময়কে দায়ী করত। ইসলাম এই শিরকি আকিদা দূর করেছে। কারণ ভালো ও মন্দ সব কিছুই আল্লাহর তাকদীর ও ফায়সালা অনুযায়ী ঘটে। বৃষ্টিকে গালি দেওয়া মূলত আল্লাহর ফায়সালার ওপর অনাস্থা জ্ঞাপন করারই নামান্তর।
বিরক্তি প্রকাশের পরিবর্তে একজন সচেতন মুসলিম বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাকে আল্লাহর নেয়ামত মনে করে সুন্নাহসম্মত আচরণ করবে:
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সায়্যিবান নাফি‘আ।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০৩২
“দুটি সময়ের দোয়া কখনো প্রত্যাখ্যান করা হয় না—আযানের সময় এবং যখন বৃষ্টির বর্ষণ ঘটে।”
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪০; সহীহ আল-জামি‘: ৩০৭৮
যদি বৃষ্টি এত প্রবল হয় যে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ফসলের ক্ষতি হয় কিংবা বন্যার উপক্রম হয়, তখনও ক্ষোভ ঝাড়ার কোনো অবকাশ নেই। বরং নবীজি ﷺ এমন পরিস্থিতিতে পাহাড়-পর্বত ও বনভূমিতে পানি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে আরজি পেশ করতেন:
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالآجَامِ وَالظِّرَابِ وَالأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা ‘আলাইনা; আল্লাহুম্মা ‘আলাল আকামি ওয়াল জিবালি ওয়াল আজামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ধ্বংস করতে আমাদের ওপর নয়। হে আল্লাহ! উঁচু ভূমি, পাহাড়-পর্বত, টিলা, উপত্যকা এবং বৃক্ষলতা জন্মানোর স্থানগুলোতে এটি বর্ষণ করুন।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০১৪; সহীহ মুসলিম: ৮৯৭
প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা দুর্বল এবং আল্লাহর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। নিজের সামান্য কাজের অসুবিধার চেয়ে আল্লাহর সৃষ্টির সার্বিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের দাবি। তাই অসন্তোষমূলক বাক্য উচ্চারণ করে আমল বরবাদ না করে আমাদের জিহ্বাকে আল্লাহর হামদ ও দোয়ায় অভ্যস্ত রাখা জরুরি।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অসাবধানতাবশত প্রাকৃতিক নেয়ামতকে দোষারোপ করার গুনাহ থেকে হেফাজত করুন এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাঁর শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর: হ্যাঁ, বৃষ্টি বা আবহাওয়াকে গালি দেওয়া কিংবা অভিশাপ দেওয়া মারাত্মক গুনাহ। কারণ বৃষ্টি আল্লাহর সরাসরি হুকুমে বর্ষিত হয়। আবহাওয়া বা সময়কে গালি দেওয়া মূলত এর পরিচালনাকারী মহান আল্লাহকেই কষ্ট দেওয়ার শামিল।
উত্তর: বৃষ্টি শুরু হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দোয়া পাঠ করতেন: 'আল্লাহুম্মা সায়্যিবান নাফি‘আ' (اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا), অর্থাৎ 'হে আল্লাহ! আমাদের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করুন।' (সহীহ বুখারী: ১০৩২)
উত্তর: হ্যাঁ, বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের অন্যতম বিশেষ মুহূর্ত। সহীহ হাদিসে এসেছে, আযানের সময় এবং বৃষ্টি বর্ষণের সময় বান্দার দোয়া সাধারণত ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
বৃষ্টির সময় অসচেতনতাবশত গালি দেওয়ার মতো পাপ থেকে বাঁচতে এই জরুরি সচেতনতামূলক আর্টিকেলটি আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।