আজকের দিনে ঘরে ঘরে বাবা-মায়েদের মুখে একটাই সাধারণ অভিযোগ—"সন্তান হাত থেকে মোবাইল নামাতেই চায় না, সারাদিন গেম আর কার্টুনেই মগ্ন থাকে।" পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মোবাইল ফোন না দিলে সন্তানরা খাওয়া-দাওয়া করতে চায় না, এমনকি পড়াশোনাতেও মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই রেগে গিয়ে বা জোর করে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এতে আসক্তি কমার চেয়ে সন্তানের জেদ ও মানসিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। ইসলাম আমাদের প্রতিটি বিষয়কে অত্যন্ত কোমলতা ও হিকমতের (কৌশল) সাথে সমাধান করতে শেখায়। আসুন আজ জেনে নিই বিজ্ঞান ও ইসলামের আলোয় সন্তানদের এই মারাত্মক স্ক্রিন অ্যাডিকশন বা মোবাইল আসক্তি দূর করার ৫টি বাস্তবমুখী ও কার্যকরী উপায়।
সন্তান আমাদের কাছে মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া অন্যতম সেরা নেয়ামত এবং একটি পবিত্র আমানত। কেয়ামতের দিন প্রতিটি অভিভাবককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল বা দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের (অধীনস্থদের) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, তাকে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৭১৩৮
তাই সন্তানকে প্রযুক্তির অভিশাপ থেকে বাঁচিয়ে দ্বীনি ও সুন্দর পরিবেশে বড় করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। নিচে এর ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
শিশুরা মূলত অনুকরণপ্রিয়। তারা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা দ্রুত শেখে। আপনি নিজে যদি সন্তানের সামনে সারাক্ষণ ফেসবুক স্ক্রোল করেন বা ইউটিউবে মগ্ন থাকেন, তবে সন্তানকে মোবাইল ছাড়তে বলা সম্পূর্ণ বৃথা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Observational Learning।
তাই সন্তানকে সময় দেওয়ার সময় নিজের মোবাইল ফোনটি দূরে রাখুন। ঘরের ভেতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন যাতে সন্তান দেখে যে বাবা-মা অবসরে বই পড়ছে, দ্বীনি আলোচনা করছে বা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। আপনি বদলালে সন্তানও আপনাকে দেখে নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করবে।
মনস্তাত্ত্বিক নিয়ম হলো, কোনো মানুষের মন থেকে একটি অভ্যাস দূর করতে হলে সেখানে অন্য একটি আকর্ষণীয় অভ্যাস প্রতিস্থাপন (Replace) করতে হয়। সন্তানের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাকে যদি ঘরের কোণে একাকী বসিয়ে রাখা হয়, তবে তার মন আরও বিষিয়ে উঠবে।
করণীয়: সন্তানকে প্রতিদিন অন্তত ১ থেকে ২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিন। তার সাথে গল্প করুন, শিক্ষামূলক ও পারিবারিক খেলায় অংশ নিন, বিকেলে পার্ক বা খোলা মাঠে হাঁটতে বা খেলতে নিয়ে যান। তার বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী গল্পের বই, সৃজনশীল খেলনা বা নতুন কিছু শেখার উপকরণ দিন, যা তার কৌতূহল ও চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করবে। যখন সন্তান পরিবার থেকে পর্যাপ্ত ভালোবাসা, মনোযোগ ও আনন্দ পাবে, তখন ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনের প্রতি তার অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও আকর্ষণ কমে আসবে।
আজকাল সন্তানরা মোবাইলে বিভিন্ন অ্যানিমেশন বা কার্টুন দেখে কাল্পনিক চরিত্রগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এই আসক্তিকে আমরা খুব সহজেই একটি সুন্দর দ্বীনি অভ্যাসে রূপান্তর করতে পারি।
সন্তানকে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে বা অবসরে বিভিন্ন নবী-রাসুল, সাহাবি এবং ইসলামের ইতিহাসের বীরদের বীরত্ব ও ত্যাগের গল্প শোনান। চমৎকার ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে গল্পগুলো উপস্থাপন করুন, যেন তার শিশুমন কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়। এতে একদিকে যেমন তার মোবাইল দেখার আগ্রহ কমবে, তেমনি ছোটবেলা থেকেই তার অন্তরে আল্লাহ, রাসুল ও ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে।
ইসলাম আমাদের জীবনকে একটি সুনির্দিষ্ট ডিসিপ্লিন বা নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে পরিচালনা করতে শেখায়। ঠিক তেমনি সন্তানের মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটি পারিবারিক গাইডলাইন বা রুটিন থাকা জরুরি।
হুট করে মোবাইল বন্ধ না করে তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করে একটি সময় নির্ধারণ করুন। যেমন—পড়াশোনা ও নামাজ ঠিকঠাক শেষ করলে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ বা ৪৫ মিনিট মোবাইল দেখতে পারবে। খাবার টেবিল, বেডরুম এবং পড়াশোনার সময়কে সম্পূর্ণ "নো-গ্যাজেট জোন" বা মোবাইল মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করুন। সন্তান যখন এই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তখন তার মানসিক শৃঙ্খল ফিরে আসবে।
সব ধরণের চেষ্টার পাশাপাশি একজন মুমিন মা-বাবার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো দোয়া। সন্তানের হেদায়েত এবং চরিত্র রক্ষার জন্য মা-বাবার দোয়া আল্লাহর দরবারে সরাসরি কবুল হয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আমাদের সন্তানদের জন্য চমৎকার দোয়া শিখিয়েছেন:
প্রতিটি নামাজের পর, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ ও সেজদায় গিয়ে সন্তানের নাম ধরে আল্লাহর কাছে কান্না করুন, যেন আল্লাহ তাকে এই যুগের সকল ফিতনা, অশ্লীলতা, ক্ষতিকর কনটেন্ট ও প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে হেফাজত করেন।
মোবাইল আসক্তি এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই এটি এক দিনে দূরও হবে না। এই প্রক্রিয়ায় আপনাকে অত্যন্ত ধৈর্যশীল হতে হবে। সন্তানকে কখনো গালমন্দ করবেন না বা মারধর করবেন না। রাগ না দেখিয়ে পরম মমতায় তাকে বোঝান এবং তার ছোট ছোট ভালো পরিবর্তনগুলোকে পুরস্কৃত বা প্রশংসা করুন।
প্রশ্ন: কত বছর বয়সে শিশুকে মোবাইল দেওয়া উচিত?
উত্তর: প্রয়োজন ও অভিভাবকের তত্ত্বাবধান অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার করানো উচিত।
প্রশ্ন: মোবাইল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া কি সমাধান?
উত্তর: না। বরং বিকল্প কার্যক্রম, নিয়মিত রুটিন ও পারিবারিক সময় বাড়ানো অধিক কার্যকর।
প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে, কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের কোমল মনে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি। শৈশবেই যদি আমরা তাদের সঠিক গাইডলাইন না দিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নানা নৈতিক, সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। আসুন, আজ থেকেই সচেতন হই এবং আমাদের সন্তানদের স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এক সুন্দর, প্রাণবন্ত ও সুন্নাহভিত্তিক শৈশব উপহার দিই।
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, বর্তমান সময়ে প্রতিটি পরিবারের জন্যই এই বিষয়টি জানা অত্যন্ত জরুরি। আপনার পরিচিত অন্যান্য বাবা-মায়েদের সচেতন করতে এবং সমাজকে এই নীরব মহামারি থেকে রক্ষা করতে কন্টেন্টটি এখনই আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে অবশ্যই শেয়ার করুন।