মুসলিম উম্মাহর মাঝে বর্তমান যুগে যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, চরম উগ্রতা এবং একে অপরকে 'কাফের' বা 'গোমরাহ' বলার প্রবণতা দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—"আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসের তৈরি?" একদল ভাই অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে তাঁকে সাধারণ মানুষের কাতার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বিশুদ্ধ 'নূর' বা আলোর তৈরি বলেন এবং দলিল হিসেবে কিছু আয়াত ও হাদিস পেশ করেন। অন্যদল ভাই তাঁর মানবীয় সত্ত্বাকে প্রমাণ করতে গিয়ে তাঁকে কেবলই 'মাটি' বা আমাদের মতো অতি সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা অনেক সময় নবীজীর ﷺ সুউচ্চ মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। অথচ আমরা যদি একটু ঠাণ্ডা মাথায় কুরআন, সহীহ হাদিস এবং গভীর বিবেক দিয়ে চিন্তা করি, তবে দেখতে পাবো যে এই দুটি মতবাদের মধ্যে কোনো আসল বিরোধ নেই। আজ আমরা কোনো পক্ষকে আক্রমণ না করে, অত্যন্ত চমৎকার ও যৌক্তিক ৩টি স্তর এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে এই বিতর্কের একটি সুন্দর ও বরকতময় সমাধান খোঁজার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
কোনো মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার আগে আমাদের বুঝতে হবে, সৃষ্টি প্রক্রিয়ার শুরুটা আমরা ঠিক কোন সময় থেকে ধরছি। মানুষের অস্তিত্বকে মূলত তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বা স্তরে ভাগ করা যায়:
"আমি তখনই নবী ছিলাম, যখন আদম (আ.) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন।"অনেকে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর নামে প্রচলিত একটি দীর্ঘ বর্ণনাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন। সমাজে প্রচলিত সেই বিবরণটি নিচে দেওয়া হলো:
— সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ৩৬০৯ (ইমাম তিরমিযী: হাসান সহীহ গরীব)
“তিনি বলেন—আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আপনার উপর আমার পিতা মাতা উৎসর্গিত হউক, আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম কোন বস্তুটি সৃষ্টি করেছেন? উত্তরে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: হে জাবের! আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম সমস্ত বস্তুর পূর্বে তাঁর নূর হতে তোমার নবীর নূর পয়দা করলেন। তারপর আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সেই নূর পরিভ্রমণ করতে লাগলো। তখন লাওহে মাহফুজ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, জিন ও মানুষ—এর কোনো কিছুই ছিল না। অতঃপর যখন আল্লাহ তা’আলা অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করার মনস্ত করলেন, তখন ওই নূরকে চার ভাগ করে প্রথম ভাগ দিয়ে কলম, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে লউহে-মাহফুজ, তৃতীয় ভাগ দিয়ে আরশে আজিম সৃষ্টি করলেন। অবশিষ্ট এক ভাগকে আবার চার ভাগে ভাগ করে প্রথম ভাগ দিয়ে আরশ বহনকারী ফেরেশতা, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে কুরছি, তৃতীয় ভাগ দিয়ে অন্যান্য ফেরেশতা সৃষ্টি করলেন। দ্বিতীয় চার ভাগের অবশিষ্ট এক ভাগকে আবার পুনরায় চার ভাগ করে প্রথম ভাগ দিয়ে আকাশ, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে জমিন, তৃতীয় ভাগ দিয়ে বেহেস্ত-দোজখ সৃষ্টি করলেন। অবশিষ্ট এক ভাগকে আবার চার ভাগে ভাগ করে প্রথম ভাগ দিয়ে মু’মিনদের নয়নের দৃষ্টি, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে কলবের নূর, তৃতীয় ভাগ দিয়ে তাদের মহব্বতের নূর তথা তাওহীদী কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’ সৃষ্টি করলেন এবং বাকী এক ভাগ দিয়ে সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলেন।”
একটি যৌক্তিক বিশ্লেষণ (বিশেষ অনুধাবন):
এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও চমৎকার ভাবনার বিষয় রয়েছে, যা আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। যারা এই বর্ণনাটিকে অকাট্য দলিল হিসেবে পেশ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সৃষ্টির উপাদানকে সাধারণ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা বা এককভাবে 'নূর' প্রমাণ করতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, এই বর্ণনাটি গ্রহণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক প্রশ্ন সামনে আসে। কারণ, এই বর্ণনার শেষ অংশেই পরিষ্কার বলা হয়েছে—নবীজী ﷺ-এর নূরের শেষ ভাগটি দিয়েই মহাবিশ্বের অন্য সবকিছু এবং সমস্ত মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন যদি এই তত্ত্বকে সঠিক ধরে নেওয়া হয়, তবে তো কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ একাই নূরের তৈরি হন না, বরং তাঁর সূত্র ধরে পৃথিবীর সকল সাধারণ মানুষ, পশুপাখি এবং জড়বস্তুও সেই একই নূরের তৈরি হয়ে যায়! তাহলে এই বর্ণনা দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সৃষ্টির উপাদানকে আমাদের থেকে আলাদা করা গেল কীভাবে? এতে তো সৃষ্টিগত উপাদানের দিক থেকে কাউকেই আলাদা করা যায় না, বরং সবাই একই উৎসের অংশ হয়ে যায়।
তাছাড়া, হাদিস বিশারদদের একটি বড় অংশের মতে, জাবের (রা.)-এর নামে প্রচলিত এই দীর্ঘ বর্ণনাটির নির্ভরযোগ্য সনদ প্রমাণিত নয়। বহু মুহাদ্দিস এটিকে অত্যন্ত দুর্বল, ভিত্তিহীন বা জাল বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে সহীহ দলিলের আলোকে আধ্যাত্মিক জগত ও হেদায়েতের উৎস হিসেবে নবীজী ﷺ অবশ্যই এক পরম 'নূর' বা জ্যোতি, যা আল্লাহ অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকময় করতে পাঠিয়েছেন (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১৫)।
এক নজরে সৃষ্টির সহজ সমীকরণ (Core Summary):
সহজ কথায় বলতে গেলে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাধারণ মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের বিষয়টি আমরা ৩টি দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে পারি:
অতএব, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সৃষ্টির সূচনাকে যে স্তর থেকেই বিবেচনা করা হোক না কেন, কোনো স্তরেই তাঁর সৃষ্টির উপাদানকে সাধারণ মানুষের চেয়ে এমনভাবে আলাদা করা যায় না যার কারণে উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে হবে কিংবা একে অপরকে কাফের ফতোয়া দিতে হবে।
অনেকেই যখন শোনেন যে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মতো একজন মানুষ, তখন তারা আপত্তি করে বলেন, "নবীজী আমাদের মতো মানুষ কীভাবে হতে পারেন?" আবার অন্যদিকে কেউ কেউ কুরআনের "আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ (বাশার)"—এই আয়াতকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন রাসূলুল্লাহ ﷺ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও সাধারণ মানুষের মতো। অথচ বাস্তবতা হলো, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিরই সঠিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—পৃথিবীতে কোনো মানুষই হুবহু অন্য কোনো মানুষের মতো নয়। প্রত্যেক মানুষের চেহারা, আঙুলের ছাপ (Fingerprint), গুণ, চরিত্র, যোগ্যতা ও সম্মান আলাদা। সুতরাং কুরআনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে "তোমাদের মতো মানুষ" বলা হয়েছে বলে এর অর্থ এই নয় যে, মর্যাদা, চরিত্র ও আল্লাহর নিকট সম্মানের দিক থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের সমান।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কাফেরদের প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে বলেছেন:
“বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ (বাশার), আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়।”
— সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০
এখানে অত্যন্ত ভালো করে লক্ষ্য করুন, কাফেরদের মূল আপত্তি কিন্তু নবীজীর চরিত্র বা গুণ নিয়ে ছিল না। কাফেরদের প্রশ্ন ছিল, "তুমি যদি আমাদের মতোই একজন মানুষ হও (যার ক্ষুধা লাগে, যে বাজারে হাঁটে), তবে তুমি নবী কীভাবে হলে? ফেরেশতা কেন এলো না?" (সূরা আল-ফুরকান: ৭)।
কাফেরদের সেই আপত্তির জবাবে আল্লাহ তাআলা গুণ, চরিত্র, সম্মান বা মর্যাদার দিক থেকে "তোমাদের মতো" বলেননি। এখানে **'তোমাদের মতো মানুষ' বলতে কেবল মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও শারীরিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে**। অর্থাৎ, তিনি কোনো ফেরেশতা বা জিন নন, তিনি মানবজাতির মধ্য থেকেই একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যার ওপর আল্লাহর বাণী (ওহী) নাজিল হয়।
মর্যাদার এই পার্থক্যটি সাধারণ মানুষের সহজে বোঝার জন্য একটি চমৎকার বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটি সাধারণ ইটের টুকরো বা ইমারত তৈরির সাধারণ পাথরও কিন্তু এক ধরণের 'পাথর'। আবার পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দামী, উজ্জ্বল এবং রাজমুকুটে শোভা পাওয়া 'ইয়াকুত' বা 'হীরা' ও এক ধরণের খনিজ পাথর। এখন কেউ যদি হীরাকে অবমূল্যায়ন করে বলে, "আরে! ওটা তো রাস্তার পাথরের মতোই একটা পাথর", তবে সেটা যেমন হীরার চরম অপমান; ঠিক তেমনি কেউ যদি অতিভক্তি দেখিয়ে বলে, "না, হীরা কোনো পাথরই নয়, ওটা আকাশ থেকে পড়া আলো"—তবে সেটাও যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল; রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমন!
আরবী কবি চমৎকার গেয়েছেন:
"মুহাম্মদ (ﷺ) একজন মানুষ, তবে তিনি সাধারণ মানুষের মতো নন;তিনি মানবীয় কাঠামোর দিক থেকে মানুষ (পাথর), কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে তিনি সৃষ্টির সেরা, আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় হাবীব (ইয়াকুত)।
তিনি তো মানুষের মাঝে ঠিক তেমনই, যেমন পাথরের মাঝে মহামূল্যবান ইয়াকুত!"
আমরা যদি ওপরের স্তরগুলো ও হীরা-পাথরের উদাহরণটি বুঝতে পারি, তবে কাফের ডাকার এই নোংরা দেয়ালটি ভেঙে যায়।
উত্তর: রাসূলুল্লাহ ﷺ কাঠামোগত ও জৈবিক দিক থেকে হযরত আদম (আ.)-এর বংশধর হিসেবে মাটি থেকে সৃষ্ট একজন মানুষ (বাশার)। তবে তিনি আধ্যাত্মিক মর্যাদা, হেদায়েত এবং পবিত্র চরিত্রের দিক থেকে গোটা মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক মহান 'নূর' বা আলো। তাই দুই দিকই নিজ নিজ স্তরে সত্য এবং কোনোটিই পরস্পরবিরোধী নয়।
উত্তর: এর অর্থ হলো কাঠামোগত ও মানবীয় বৈশিষ্ট্য (যেমন রক্ত-মাংসের দেহ, ক্ষুধা লাগা, পিতা-মাতার মাধ্যমে জন্ম)। আল্লাহ এখানে গুণ, ব্যবহার বা সম্মানের দিক থেকে তুলনা করেননি। রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষ হলেও তিনি সাধারণ মানুষের মতো নন, বরং অনন্য ও সৃষ্টির সেরা মানুষ।
উত্তর: হাদিস গবেষক ও মুহাদ্দিসগণের মতে, জাবের (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত 'নূরে মুহাম্মাদী'-সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদিসটির কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ বা ভিত্তি নেই। এটি হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় অত্যন্ত দুর্বল বা বানোয়াট (জাল) হিসেবে গণ্য।
ইসলাম আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, পরম পরমতসহিষ্ণুতা এবং ঐক্যের শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সৃষ্টিতত্ত্বের মতো একটি গভীর ও সূক্ষ্ম বিষয়কে কেন্দ্র করে একে অপরকে কাফের বা গোমরাহ বলে ফতোয়া দেওয়া চরম অজ্ঞতা ও শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, তিনি নূর হোন বা মাটি, তিনি আমাদের প্রিয় নবী, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম রাসূল এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহর অনুমতিতে সর্বশ্রেষ্ঠ শাফাআতের অধিকারী। বিতর্কে না জড়িয়ে তাঁর দেখানো সুন্নাহকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর প্রতি খাঁটি দুরুদ ও ভালোবাসা পোষণ করাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উগ্রতা ও সংকীর্ণতা পরিহার করে দ্বীনের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বুঝ দান করুন এবং মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে দিন। আমীন।
উম্মাহর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে এবং এই ভারসাম্যপূর্ণ সুন্দর ইসলামিক গাইডলাইনটি সবার মাঝে পৌঁছে দিতে আর্টিকেলটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। জাজাকাল্লাহু খাইরান।