সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবত ও ট্রোলিং: অজান্তেই আমল ধ্বংসের আধুনিক মাধ্যম

সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবত ও সাইবার বুলিং

স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের যোগাযোগকে সহজ করলেও গুনাহের পথকেও সহজ করে দিয়েছে। আজকাল কমেন্ট বক্স বা ইনবক্সে কাউকে নিয়ে ট্রোল করা, উপহাস করা কিংবা গীবত করাকে আমরা বিনোদন মনে করি। জানুন কীভাবে স্ক্রিনের পেছনের এই ছোট একটি মন্তব্য আমাদের আখিরাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

মানবজাতির ধ্বংসের অন্যতম বড় একটি কারণ হলো জিহ্বা বা মুখের গুনাহ। প্রাচীনকালে মানুষ সামনাসামনি বসে গীবত বা পরনিন্দা করত।

কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান যুগে গীবত করার মাধ্যম ও পরিধি বদলে গেছে। একে আমরা বলতে পারি— ডিজিটাল গীবত বা সাইবার পরনিন্দা।

এখন একজন মানুষ ঘরে বসেই একটি কমেন্ট বা পোস্টের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কাছে গীবত পৌঁছে দিতে পারে। অথচ ইসলাম এই ধরণের আচরণকে মারাত্মক গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

“দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে সামনে ও পেছনে মানুষের নিন্দা করে (দোষ খুঁজে বেড়ায়)।”
— সূরা আল-হুমাযাহ (১০৪:১)

এই ছোট আয়াতটি বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্স বা ট্রোল পেজগুলোর জন্য এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা।

১. ইসলামে গীবতের সংজ্ঞা এবং বর্তমান বাস্তবায়ন

অনেকে মনে করেন, কারো নামে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলাই কেবল গুনাহ। কিন্তু আপনার ভাই বা বোনের ভেতরের কোনো সত্য দোষও যদি তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করেন—সেটাই গীবত।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সেলিব্রিটি, পরিচিত ব্যক্তি বা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কোনো দুর্বলতা নিয়ে পোস্ট বা ভিডিও শেয়ার করা সরাসরি এই গীবতের অন্তর্ভুক্ত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?’ তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, “তোমার ভাই (অনুপস্থিতিতে) যা অপছন্দ করে, তার সম্পর্কে সে রূপ আলোচনা করা।” জিজ্ঞেস করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই বিদ্যমান থাকে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে।”
— সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯

২. ট্রোলিং ও সাইবার বুলিং: অন্যকে উপহাস করার ভয়ানক গুনাহ

ফেসবুক বা ইউটিউবে কারো ভুলত্রুটি বা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে মিম (Meme) বানানো, ট্রোল করা বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা এখন নিত্যদিনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা হয়তো ভাবি, একটু বিনোদন বা মজার জন্যই তো করছি! কিন্তু ইসলাম কাউকে উপহাস করা, ব্যঙ্গ করা বা মন্দ নামে ডাকার অধিকার কাউকেই দেয়নি।

“হে ঈমানদারগণ! কোনো মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোনো মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে, কেননা তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে… আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না…”
— সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:১১)

৩. ডিজিটাল গীবতের ভয়াবহতা ও আমল পুড়ানোর মহামারী

বাস্তব জীবনের গীবতের চেয়ে ডিজিটাল গীবতের গুনাহ এবং ছড়িয়ে পড়ার গতি বহুগুণ বেশি। সামনাসামনি গীবত করলে তা বড়জোর ৪-৫ জন মানুষ শোনে।

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ট্রোল পোস্ট, ভিডিও বা কমেন্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার বা লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

যত মানুষ সেই পোস্ট দেখবে, শেয়ার করবে বা হাসাহাসি করবে, তার একটি বড় অংশ গুনাহের খতিয়ান মূল পোস্টদাতার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। এটি নেক আমলকে দ্রুত পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:- “তোমরা হিংসা ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা ও গীবত মানুষের নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে (ধ্বংস করে), যেমন আগুন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।”
— সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩

৪. আখিরাতের সবচেয়ে বড় 'দেউলিয়া' কারা?

আমরা হয়তো সারাদিন নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি এবং কুরআন তিলাওয়াত করছি। কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে কাউকে নিয়ে একটা নোংরা কমেন্ট বা ট্রোল শেয়ার করে দিলাম।

কিয়ামতের দিন এই ব্যক্তিই হবে সবচেয়ে বড় দেউলিয়া বা নিঃস্ব। কারণ যার গীবত বা ট্রোল করা হয়েছে, তাকে নিজের নেক আমল দিয়ে দিতে হবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?’ সাহাবিরা বললেন, আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই, সেই তো দেউলিয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আমার উম্মতের মধ্যে সে ব্যক্তিই আসল দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, যাকাতসহ বহু নেক আমল নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু সে দুনিয়ায় কাউকেও গালি দিয়েছে, কারও প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে, কারও সম্পদ গ্রাস করেছে, কাউকে আঘাত করেছে। সুতরাং কিয়ামতের দিন সেই মজলুমদেরকে এই ব্যক্তির নেক আমল থেকে দিয়ে দেওয়া হবে। দিতে দিতে যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে সেই মজলুমদের গুনাহসমূহ এনে এই ব্যক্তির ওপর চাপানো হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
— সহীহ মুসলিম: ২৫৮১

৫. যাচাই না করে যেকোনো তথ্য বা গুজব শেয়ার করার পরিণতি

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো খবর দেখলেই আমরা সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে কমেন্ট করা বা শেয়ার করা শুরু করি। অনেক সময় এর মাধ্যমে একজন নির্দোষ মানুষের চরিত্র হনন করা হয়।

ইসলাম স্পষ্ট বলেছে, সত্যতা নিশ্চিত না করে কোনো কথা ছড়ানো একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:- “কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তা-ই মানুষের কাছে বলে বেড়ায়।”
— সহীহ মুসলিম: ৫

ডিজিটাল ফিতনা থেকে বাঁচার উপায় — একজন মুমিনের করণীয়

স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারি, তবে এটি আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। তাই এই ফিতনা থেকে বাঁচতে আমাদের নিচের অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে হবে:

  • টাইপ করার আগে চিন্তা করা: কোনো কমেন্ট বা পোস্ট করার আগে ভাবুন, এই কথাটি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে জাবাবদিহি করতে পারবেন কি না।
  • ট্রোল পেজগুলো আনফলো করা: যেসব পেজ বা গ্রুপে মানুষকে নিয়ে উপহাস ও ট্রোল করা হয়, সেগুলোকে আজই আনফলো ও লিভ করুন।
  • মৌনতা অবলম্বন করা: কোনো বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে সেখানে চুপ থাকা বা কোনো মন্তব্য না করাই একজন মুমিনের পরিচয়।
  • অযথা বিতর্ক এড়িয়ে চলা: কমেন্ট বক্সে কারো সাথে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বা তর্কে লিপ্ত না হয়ে নিজের সময় ও আমল রক্ষা করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:- “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং পরকালের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অন্যথায় চুপ থাকে।”
— সহীহ বুখারী: ৬০১৮ — সহীহ মুসলিম: ৪৭

উপসংহার

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের আঙুল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে টাইপ করা প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি ক্লিকের হিসাব ফেরেশতারা লিখে রাখছেন। পর্দার আড়ালে বা ফেক আইডি ব্যবহার করে মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহর চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।

আসুন, সোশ্যাল মিডিয়াকে আমল ধ্বংসের মাধ্যম না বানিয়ে দ্বীন প্রচার এবং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ডিজিটাল যুগের এই ভয়ানক ফিতনা থেকে নিজেদের জিহ্বা, হাত এবং আমলকে হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

আর্টিকেলটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই শেয়ার করে আপনার বন্ধুদেরও সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিন।