বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের ফলে সমগ্র জীবজগৎ এক মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। তবে আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান আজ যেসব সংকটের কথা বলছে, ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই তার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করে গেছে। ইসলামি জীবনদর্শনে বৃক্ষরোপণ কেবল একটি পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক কাজ নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতত্ত্বের নিদর্শন, একটি পুণ্যময় সামাজিক দায়িত্ব এবং মৃত্যুর পরেও চলমান সদকায়ে জারিয়ার এক অনন্য মাধ্যম। আসুন পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব, পরিবেশ সংরক্ষণের নীতিমালা এবং এর অসীম পরকালীন মর্যাদা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বৃক্ষ ও উদ্ভিদের অপরূপ সৃষ্টিকে মানুষের জন্য এক অনন্য নেয়ামত এবং তাঁর কুদরতের স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً ۖ لَّكُم مِّنْهُ شَرَابٌ وَمِنْهُ شَجَرٌ فِيهِ تُسِيمُونَ يُنبِتُ لَكُم بِهِ الزَّرْعَ وَالزَّيْتُونَ وَالنَّخِيلَ وَالْأَعْنَابَ وَمِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য পানীয় এবং তা থেকে জন্মায় বৃক্ষরাজি, যাতে তোমরা পশু চরাও। এর দ্বারা তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, জয়তুন (জলপাই), খেজুর, আঙুর এবং সর্বপ্রকার ফলমূল। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১০-১১
গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আমাদের জন্য জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে, মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং সমগ্র প্রাণীকুলের খাদ্যের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বৃক্ষরোপণকে সাধারণ কোনো কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং একে একটি জীবন্ত ইবাদতে রূপান্তরিত করেছেন। কোনো মুসলিমের রোপণ করা গাছ থেকে যদি সামান্যতম কোনো উপকারও কেউ পায়, তার বিনিময় রোপণকারীর আমলনামায় পুণ্য হিসেবে জমা হতে থাকে:
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“কোনো মুসলিম যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি কিংবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৫৩
এমনকি সহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় (হাদিস: ১৫৫২) আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“আর যা কিছু চুরি হয়ে যাবে, তা-ও রোপণকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি আপনার গাছের ফল চুরি করেও খেয়ে ফেলে, তবুও সেই ফলের জন্য আপনি আল্লাহর কাছে সদকার সওয়াব পাবেন।
কর্মোদ্যম, ইতিবাচক মানসিকতা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার এমন অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো জীবনদর্শনে খুঁজে পাওয়া বিরল। কিয়ামতের মতো মহাপ্রলয়ঙ্কর ও ভীতিকর মুহূর্তেও মানবতার মুক্তির দূত রাসূলুল্লাহ ﷺ বৃক্ষরোপণের অটল নির্দেশ দিয়ে গেছেন:
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“যদি কিয়ামত সমাগত হয়ে পড়ে এবং তোমাদের কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন কিয়ামত পুরোপুরি কায়েম হওয়ার আগেই চারাটি রোপণ করে দেয়।”
— মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২; আল-আদাবুল মুফরাদ (ইমাম বুখারী), হাদিস: ৪৭৯ (হাদিসটি সহীহ)
বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—যে মুহূর্তে গোটা পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, মানুষ তার প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা, সেই মুহূর্তে একটি গাছের চারা রোপণ করে কী লাভ হবে? এই চারা তো বড় হওয়ার সময় পাবে না, ফল দেওয়ার সুযোগও থাকবে না। কিন্তু ইসলামিক চিন্তাবিদ ও মুহাদ্দিসগণ এই হাদিস থেকে কয়েকটি অত্যন্ত গভীর ও চিরন্তন জীবনদর্শন উন্মোচন করেছেন:
যেখানে ইসলাম বৃক্ষরোপণকে ইবাদত বানিয়েছে, সেখানে অহেতুক বা নিছক খেয়ালখুশির বশে গাছ কাটাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করেছে। যুদ্ধের মতো চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও মুসলিম সৈন্যদের ফলবান ও ছায়াদানকারী গাছ কাটতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছিল।
“যে ব্যক্তি (বিনা প্রয়োজনে ও অন্যায়ভাবে) কুলগাছ কেটে ফেলবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে উপুড় করে নিক্ষেপ করবেন।”ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো সেই কুলগাছ, যা মরুপ্রান্তরের নির্জন পথে পথিক ও প্রাণীদের ছায়া দেয়; কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায়ভাবে তা কেটে দেয়, তবে সে এই শাস্তির মুখোমুখি হবে।
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫২৩৯ (সহীহ)
ইসলামে গাছের সাথে মুমিনের চরিত্রের এক চমৎকার সাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন:
“গাছপালার মধ্যে এমন একটি গাছ আছে যার পাতা কখনো ঝরে পড়ে না এবং এটি হলো মুমিনের দৃষ্টান্ত। তোমরা কি বলতে পারো সেটি কোন গাছ?” সাহাবীগণ বনের বিভিন্ন গাছের নাম ভাবতে লাগলেন। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমার মনে হলো এটি খেজুর গাছ, কিন্তু বয়সে ছোট হওয়ায় আমি বলতে সংকোচ বোধ করলাম। অবশেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বললেন: “এটি হলো খেজুর গাছ।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১১
খেজুর গাছের প্রতিটি অঙ্গ—ফল, ছাল, পাতা ও কাঠ যেমন মানুষের উপকারে আসে এবং এর কোনো অংশ নষ্ট হয় না, তেমনি একজন খাঁটি মুমিনের ব্যক্তিত্ব, কথা ও কাজ দ্বারা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ উপকৃত হয়।
বৃক্ষরোপণকে কেবল সরকারি বা সামাজিক ক্যাম্পেইন মনে না করে একে পরকালীন নাজাতের উসিলা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আমাদের প্রত্যেকের উচিত বাড়ির আশপাশে, রাস্তার ধারে বা পতিত জমিতে ফলজ, বনজ কিংবা ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা এবং তার উপযুক্ত পরিচর্যা করা। আমাদের লাগানো একটি গাছের ছায়ায় বসে যতক্ষণ কোনো মানুষ প্রশান্তি পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আমলনামায় সদকা লিপিবদ্ধ হতে থাকবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে তাঁর দেওয়া প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করার, বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সদকায়ে জারিয়া অর্জন করার এবং সৃষ্টির কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর: হ্যাঁ, গাছ লাগানো একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকায়ে জারিয়া। যতদিন সেই গাছ বেঁচে থাকবে এবং তা থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীট-পতঙ্গ ফল, পাতা বা ছায়া গ্রহণ করবে, ততদিন রোপণকারীর আমলনামায় নিরবচ্ছিন্নভাবে সদকার সওয়াব লেখা হতে থাকবে।
উত্তর: হ্যাঁ, সহীহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, রোপণকৃত গাছ থেকে যদি কোনো মানুষ বা প্রাণী চুরি করে কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবেও কিছু খেয়ে ফেলে, তবে তা-ও রোপণকারীর পক্ষ থেকে আল্লাহর দরবারে সদকা হিসেবে কবুল করা হয়।
উত্তর: বিনা প্রয়োজনে বা নিছক ধ্বংসের উদ্দেশ্যে পথচারী ও প্রাণীদের ছায়া দেওয়া গাছ কাটা মারাত্মক গুনাহ। সুনানে আবু দাউদের সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে মরুভূমির কুলগাছ কাটবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে উপুড় করে নিক্ষেপ করবেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরকালীন সওয়াব অর্জনের এই অনুপম বার্তাটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে আর্টিকেলটির লিংক শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।