রাস্তা দখল ও জনসাধারণের ভোগান্তি: ইসলাম ও হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি

ইসলামে রাস্তার অধিকার ও জনসাধারণের যাতায়াত

আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে যখন পৃথিবীর বুকে আধুনিক নগর পরিকল্পনা (Town Planning) কিংবা ট্রাফিক আইনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তখন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতিকে এমন এক বৈপ্লবিক ও দূরদর্শী সামাজিক আইন উপহার দিয়েছেন যা বর্তমান যুগেও এক অনন্য আদর্শ। অথচ আধুনিক যুগে সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছেও আমরা প্রায়শই একটি মারাত্মক ব্যাধি ও অসচেতনতা দেখতে পাই—তাহলো জনসাধারণের যাতায়াতের সাধারণ রাস্তা দখল করা। সমাজে অনেকেই রাস্তার ওপর ইটের স্তূপ বা দোকান বসিয়ে রাখছেন, কেউবা নিজের সীমানা বাড়াতে গিয়ে রাস্তা সংকীর্ণ করে ফেলছেন, যার ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা স্কুলগামী শিশুরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ইসলামে রাস্তার অধিকার ও জনকল্যাণকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের চলাচলের পথে সামান্য কষ্ট দেওয়াকেও বড় গুনাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। আসুন আজ প্রিয় নবী ﷺ-এর সেই চমৎকার নাগরিক গাইডলাইনগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।

১. রাস্তার বিবাদে 'সাত হাত' ছাড়ার ঐতিহাসিক সুন্নাহ

জমি বা রাস্তা তৈরি নিয়ে যদি কখনো বিবাদ তৈরি হয়, তবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাস্তাটি কতটা চওড়া রাখতে হবে, তার স্পষ্ট পরিমাপ প্রিয় নবী ﷺ নির্ধারণ করে গেছেন। এটি ইসলামের অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী একটি আইন।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—যখন কোনো রাস্তার প্রস্থ বা সীমানা নিয়ে মানুষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তখন যেন তার প্রস্থ "সাত হাত" নির্ধারণ করা হয়।

"তোমরা যখন রাস্তার চওড়া বা সীমানা নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তখন তার পরিমাপ সাত হাত নির্ধারণ করো।"
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১৩

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধাকে ইসলাম কতটা অগ্রাধিকার দিয়েছে। সাত হাত নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেন অন্তত দুটি বাহন (তৎকালীন সময়ে উট বা গাধা) একে অপরকে পাশ কাটিয়ে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। ১৪০০ বছর আগে দেওয়া রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই প্রশংসনীয় সূত্র মেনে চললে বর্তমান যুগেও যেকোনো পাড়া-মহল্লার রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

২. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো: ঈমানের অন্যতম শাখা

ইসলামে রাস্তা শুধু চলাচলের স্থান নয়, এটি ইবাদতেরও একটি অংশ হতে পারে। রাস্তায় একটি ইটের টুকরো, পাথরের কণা, কাঁচ, কাঁটা কিংবা ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকলে তা সরিয়ে দেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব।

  • ঈমানের একটি শাখা: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
    “ঈমানের সত্তরেরও অধিক (অথবা ষাটেরও অধিক) শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতাও ঈমানের একটি শাখা।”
    — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫
  • সদকার সওয়াব: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
    “রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও একটি সদকা।”
    — সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৯৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৯
  • জান্নাত লাভের উসিলা: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
    “এক ব্যক্তি রাস্তার উপর একটি কাঁটাযুক্ত গাছের ডাল দেখতে পেয়ে বলল, ‘আল্লাহর কসম! আমি এটি মুসলিমদের পথ থেকে সরিয়ে দেব, যাতে তাদের কষ্ট না হয়।’ অতঃপর এ কারণে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো।”
    — সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১৪

৩. বর্তমান সমাজ চিত্র: রাস্তা দখল ও জনসাধারণের হাহাকার

দুঃখজনক হলেও সত্য, হাদিসের এই সুন্দর ও দূরদর্শী শিক্ষার বিপরীতে বর্তমান সমাজে আমরা এমন কিছু অসচেতনতা ও অনিয়ম দেখতে পাই, যা জনসাধারণের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে এবং মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ) ক্ষুণ্ন করে।

ক. দোকান ও বাড়ি বাড়িয়ে রাস্তা ছোট করা: অনেকেই নিজের দোকানের সামনের অংশ বা বাড়ির সীমানা প্রাচীর একটু বাড়িয়ে ফুটপাত বা জনসাধারণের রাস্তা দখল করে নেন। অথচ এটি মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ) নষ্ট করার শামিল। মনে রাখবেন, অন্যের এক বিঘত জমিও যদি কেউ অন্যায়ভাবে দখল করে, কেয়ামতের দিন সাত স্তর জমি তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত জমিনের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হবে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪৫২; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১০

যখন অন্যের সামান্য জমি অন্যায়ভাবে দখল করার জন্য এত কঠিন শাস্তির ঘোষণা এসেছে, তখন জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা দখল করা বা সংকীর্ণ করে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা যে কত বড় অন্যায়, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো রাস্তার অধিকার রক্ষা করা এবং মানুষের চলাচলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা।

খ. রাস্তায় নির্মাণ সামগ্রী ও আবর্জনা রাখা: বাড়ি বা দোকান তৈরির সময় মাটি, বালু, ইট, পাথর মাসের পর মাস রাস্তার ওপর ফেলে রাখা আমাদের চারপাশের একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাতাসে সেই বালু উড়ে মানুষের চোখে যায়, বৃষ্টির দিনে রাস্তা কাদা হয়ে যায় এবং পথচারীরা পিছলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা, ড্রেনের নোংরা পানি বা অন্যান্য বর্জ্য রাস্তায় ফেলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করাও এই অন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

৪. যাতায়াতে বাধা সৃষ্টির ব্যাপারে ইসলামের কঠোর হুঁশিয়ারি

রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের রাস্তার পাশে অনর্থক বসে থাকতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। সাহাবিরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের তো সেখানে বসা ছাড়া উপায় নেই; আমরা সেখানে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলি।” তখন তিনি বললেন, “যদি তোমাদের বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করো।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তার হক কী?” তিনি বললেন:

১. দৃষ্টি অবনত রাখা।
২. কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা।
৩. সালামের উত্তর দেওয়া।
৪. সৎ কাজের আদেশ করা।
৫. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২১২১

এই হাদিস থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, রাস্তা শুধু চলাচলের স্থান নয়; এটি এমন একটি জনসাধারণের অধিকার, যার প্রতি প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব রয়েছে। তাই রাস্তায় জটলা করে মানুষের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করা, রাস্তা নোংরা করা, পথচারীদের কষ্ট দেওয়া কিংবা অন্যের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা ও উত্তম চরিত্রের পরিপন্থী।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: রাস্তার বিবাদে সাত হাত ছাড়ার হাদিসের মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, জনস্বার্থে বা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সীমানার ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে, যাতে রাস্তা সংকীর্ণ না হয় এবং যেকোনো সাধারণ যানবাহন সহজে যাতায়াত করতে পারে।

প্রশ্ন ২: রাস্তা দখল করে বা রাস্তা ছোট করে কোনো স্থাপনা তৈরি করা কি জায়েজ?

উত্তর: না। জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত রাস্তা অন্যায়ভাবে দখল করা বা সংকীর্ণ করে মানুষের চলাচলে কষ্ট সৃষ্টি করা ইসলামে জায়েজ নয়। এটি মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ) লঙ্ঘনের শামিল। তাই এ ধরনের অন্যায় থেকে বিরত থাকা, দখলকৃত জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা একজন মুসলিমের কর্তব্য।

প্রশ্ন ৩: রাস্তায় ময়লা ফেলা বা যাতায়াতে কষ্ট দিলে কি ঈমান দুর্বল হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, যেহেতু রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ঈমানের একটি শাখা, সেহেতু রাস্তায় কষ্টদায়ক বস্তু ফেলা বা রাস্তা আটকে মানুষের চলাচলে বাধা দেওয়া ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ এবং এটি একটি বড় সামাজিক অপরাধ।

উপসংহার: আমাদের করণীয় ও আত্মশুদ্ধি

আমরা যদি একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের ব্যক্তিস্বার্থের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নিজের সাময়িক সুবিধার জন্য রাস্তার ওপর এমন কিছু রাখা বা এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা অন্য মানুষের, কোনো বৃদ্ধের, শিশুর বা মুমূর্ষু রোগীর চলাচলে সামান্যতম কষ্টের কারণ হয়। প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ যে চমৎকার সামাজিক শিক্ষা ও নীতিমালা আমাদের শিখিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করার মাধ্যমেই একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করা ও রাস্তা দখলের মতো মারাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক শিক্ষাটি সবার মাঝে পৌঁছে দিতে আর্টিকেলটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। জাজাকাল্লাহু খাইরান।