ঘরে অভাব-অনটন দূর করার ৩টি পরীক্ষিত ইসলামিক উপায় ও সুন্নাহ আমল

সংসারে অভাব-অনটন দূর করার ইসলামিক উপায় ও আমল

বর্তমান সময়ে আমাদের অনেকের মাঝেই একটি সাধারণ হাহাকার দেখা যায়—"এত টাকা আয় করি, তাও মাস শেষে হাতে কোনো টাকা থাকে না!" কিংবা "দিনরাত পরিশ্রম করেও ঘরের অভাব-অনটন কিছুতেই দূর হচ্ছে না।" আসলে রিযিক বা আয় বাড়লেই কিন্তু অভাব দূর হয় না, যদি না সেই আয়ের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া 'বরকত' বা কল্যাণ থাকে। ইসলাম আমাদের কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বলেনি, বরং হালাল উপার্জনের চেষ্টার পাশাপাশি এমন কিছু আমল শিখিয়েছে যা ঘরের অভাব দূর করে রিযিকের দরজা খুলে দেয়। আজ আমরা আলোচনা করব ঘরে অভাব-অনটন দূর করার ৩টি অত্যন্ত শক্তিশালী ও পরীক্ষিত ইসলামিক আমল নিয়ে।

রিযিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা। তিনি পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীতে এমন কোনো জীব নেই যার রিযিকের দায়িত্ব তিনি নেননি। তবে অনেক সময় আমাদের নিজেদের কিছু ভুলত্রুটি, অবহেলা কিংবা গুনাহের কারণে আমাদের রিযিক সংকুচিত হয়ে যায়। সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী যদি আমরা নিচের ৩টি কাজ সঠিকভাবে করতে পারি, তবে ইনশাআল্লাহ ঘরে কখনো অভাব প্রবেশ করতে পারবে না।

১. ঘরে প্রবেশের সময় সুন্নাহসম্মত সালাম ও সুরা ইখলাসের আমল

ঘরে বরকত নিয়ে আসার এবং অভাব দূর করার সবচেয়ে সহজ ও পরীক্ষিত সুন্নাহ আমল হলো ঘরে ঢোকার সময় সালাম দেওয়া এবং সুরা ইখলাস পাঠ করা। সাহাবি হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, একজন ব্যক্তি নবীজী ﷺ এর কাছে এসে নিজের দারিদ্র্য ও অভাবের অভিযোগ করল। তখন আল্লাহর রাসুল ﷺ তাকে বললেন:

“তুমি যখন তোমার ঘরে প্রবেশ করবে, তখন ঘরে কেউ থাকুক বা না থাকুক, সালাম দেবে। এরপর আমার ওপর দরুদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়বে এবং একবার ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস) পাঠ করবে।”
— তাফসিরে কুরতুবি (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬১)

ওই সাহাবি বলেন, আমি নবীজী ﷺ এর শেখানো এই আমলটি নিয়মিত করতে লাগলাম। কিছুদিন পর আল্লাহ আমার অভাব তো দূর করলেনই, এমনকি আমার প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদেরও আল্লাহ অভাবমুক্ত ও ধনী বানিয়ে দিলেন!

আমল করার নিয়ম: যখনই বাইরে থেকে ঘরে ঢুকবেন, প্রথমে উচ্চস্বরে "আসসালামু আলাইকুম" বলবেন (ঘরে কেউ না থাকলেও ফেরেশতাদের নিয়তে সালাম দেবেন)। এরপর মনে মনে সংক্ষেপে দরুদ পড়ে একবার সুরা ইখলাস তিলাওয়াত করবেন। এটি ঘরের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর করে বরকতের হাওয়া বয়ে আনে।

২. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা

আমাদের জীবনে অভাব আসার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমাদের জানা-অজানা নানা গুনাহ। গুনাহ মানুষের রিযিককে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আর এই গুনাহ মোচনের একমাত্র চাবিকাঠি হলো 'ইস্তিগফার' বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। সুরা নূহ-এর ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ চমৎকারভাবে ঘোষণা করেছেন:

“তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো (ইস্তিগফার করো), নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী-নালা প্রবাহিত করবেন।”
— সুরা নূহ, আয়াত: ১০-১২

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ও আঠার মতো ইস্তিগফারকে আঁকড়ে ধরে রাখবে, আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। তাই সারাদিন ওজু-বেওজু অবস্থায় চলতে-ফিরতে মুখে **"আস্তাগফিরুল্লাহ"** কিংবা **"আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি"** জারি রাখুন।

৩. আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের ওপর 'শুকরিয়া' বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

অভাব দূর করার তৃতীয় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক উপায় হলো—অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মানুষ যখন যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে সবসময় "নাই নাই" করতে থাকে, তখন তার ভেতরের মানসিক দারিদ্র্য আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন:

“যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো (শুকরিয়া আদায় করো), তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো আমার শাস্তি অবশ্যই অত্যন্ত কঠোর।”
— সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭

কীভাবে শুকরিয়া জানাবেন? প্রতিদিন সকালে ও রাতে আপনার যা কিছু আছে (সুস্থতা, মাথা গোঁজার ঠাঁই, দুবেলা খাবার) তার জন্য অন্তর থেকে বলুন **"আলহামদুলিল্লাহ"**। নবীজী ﷺ বলেছেন, রিযিকের ব্যাপারে সবসময় নিজের চেয়ে নিচের দিকে (যারা আপনার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে) তাকাও, তাহলে আল্লাহর নেয়ামতের কদর বুঝতে পারবে।

উপসংহার: তাকওয়াই হলো আসল চাবিকাঠি

সংক্ষেপে বলতে গেলে, রিযিকের অভাব দূর করার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে আল্লাহর ভয় বা ‘তাকওয়া’র মধ্যে। আমরা যদি গুনাহ পরিহার করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করি এবং এই ৩টি সুন্নাহ আমল আমাদের অভ্যাসে পরিণত করি, তবে ঘরের আর্থিক অনটন দূর হতে বাধ্য।

প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, বর্তমানের এই অগ্নিমূল্যের বাজারে বহু পরিবার চরম আর্থিক অনটন ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ঘরে বরকতের বার্তা পৌঁছে দিতে এবং এই পরীক্ষিত সুন্নাহ আমলগুলো সম্পর্কে জানাতে আর্টিকেলটি এখনই আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে বা পরিচিতদের মাঝে অবশ্যই শেয়ার করুন।