বর্তমান সমাজে প্রায়ই একটি আক্ষেপ শোনা যায়—"যাকেই সাহায্য করি, সেই ক্ষতি করে" কিংবা "উপকার করলে অপকার মেলে।" এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে অনেকেই মানুষের উপকার করা ছেড়ে দেন বা চরম হতাশায় ভোগেন। কিন্তু ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানবসেবা ও পরোপকারকে অন্য কোনো মানুষের প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়নি। ইসলামে পরোপকার হলো সরাসরি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। আসুন আজ পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে জেনে নিই—মানুষ অকৃতজ্ঞ হলেও কেন আমাদের সাহায্য করা অব্যাহত রাখা উচিত, উপকারের বদলে অপকার পেলে করণীয় কী এবং ইসলামে সতর্কতার ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে হয়।
স্বার্থপরতা ও অকৃতজ্ঞতা বর্তমান সমাজের এক বড় ব্যাধি। বহু মানুষ বিপদের সময় হাত পেতে সাহায্য নিলেও সুবিধা পাওয়ার পর উপকারীর অবদান ভুলে যায়; এমনকি উল্টো ক্ষতি করার চেষ্টাও করে। এই পরিস্থিতির কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—তবে কি মানুষের উপকার করা বন্ধ করে দেওয়াই নিরাপদ?
ইসলাম এই ধরনের নেতিবাচক ধারণাকে সমর্থন করে না। ইসলাম আমাদের শেখায় মানুষের সাথে সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ সাময়িক দুনিয়ার লাভ-ক্ষতির ওপর নয়, বরং আখেরাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে গড়ে তুলতে।
ইসলামে মানুষকে সাহায্য করা কেবল সাধারণ কোনো সামাজিক কাজ নয়; বরং এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ইবাদত। যিনি অন্য মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন, স্বয়ং মহান আল্লাহ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন:
“আল্লাহ তাআলা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯
অন্য একটি বর্ণনায় মানুষের উপকার করার বিশেষ মর্যাদার কথা এসেছে: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মানুষের মধ্যে উত্তম সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।”
— সহীহ আল-জামে, হাদিস: ৩২৮৯; শাইখ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
আমরা যখন কারও উপকার করি এবং তার কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ আশা করি, তখন সে অকৃতজ্ঞ হলে আমাদের মনে কষ্ট আসে। কিন্তু মুমিনের কাজের নিয়ত মানুষের কাছে প্রশংসার জন্য নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত থাকে।
পবিত্র কুরআনে নেককার বান্দাদের এই মনোভাব তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার করাই; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ৯
এই মানসিকতা যদি অন্তরে থাকে, তবে উপকার পাওয়ার পর মানুষ ভুলে গেলেও বা ক্ষতি করার চেষ্টা করলেও আমাদের ভালো কাজের সওয়াব নষ্ট হয় না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগেও এমন বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন সাহাবীগণ। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে এমন এক সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল:
“হে আল্লাহর রাসুল! আমার এমন কিছু আত্মীয় আছে, আমি যাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি কিন্তু তারা তা ছিন্ন করে; আমি তাদের উপকার করি কিন্তু তারা আমার অপকার করে; আমি তাদের সাথে ধৈর্যশীল আচরণ করি কিন্তু তারা আমার সাথে মূর্খতা প্রদর্শন করে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: তুমি যদি এমন অবস্থাতেই অবিচল থাকো, তবে তুমি যেন তাদের মুখে জ্বলন্ত ছাই ঢুকিয়ে দিচ্ছ। আর যতক্ষণ তুমি এ অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ তোমার সাথে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী নিয়োজিত থাকবে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৮
এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আত্মীয়রা সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ ও সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা বড় নেক আমল। এমন পরিস্থিতিতে বান্দা যদি ন্যায়ের পথে অবিচল থাকে, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য সাহায্যকারী থাকার সুসংবাদ রয়েছে। তাই অন্যের খারাপ আচরণ আমাদের ভালো আচরণ থেকে বিরত রাখার কারণ হওয়া উচিত নয়।
ইসলাম যেমন মানুষকে সাহায্য করার নির্দেশ দেয়, তেমনি মুমিনকে অন্ধ বা অসচেতন হতে নিষেধ করে। কারও স্বভাবগত প্রতারণা বা ক্ষতিকর রূপ প্রকাশ পেলে একই ভুলের ফাঁদে বারবার পড়া উচিত নয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“একজন মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬১৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৮
এর অর্থ হলো, আমরা মানুষকে সাহায্য করব প্রজ্ঞার সাথে এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির খারাপ আচরণের কারণে পুরো সমাজের মানুষের উপকার করা বন্ধ করা যাবে না।
খারাপের বদলে খারাপ আচরণ করা সাধারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য, কিন্তু খারাপের জবাবে উত্তম আচরণ করে হৃদয় জয় করাই ইসলামের শিক্ষা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
“ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দের মোকাবিলা করো যা উত্তম তা দিয়ে; তাহলে দেখতে পাবে তোমার সাথে যার চরম শত্রুতা ছিল, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪
মানুষের অকৃতজ্ঞতা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বিষয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত সৎকাজের প্রতিদান অবিনশ্বর। কোনো মানুষের অসদাচরণ যেন আমাদের পরোপকারের মতো মহান আমল থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম আমাদের নিজের ক্ষতির আশঙ্কা জেনেও বারবার একই ব্যক্তির কাছে অসতর্কভাবে সাহায্য করতে বলে। বরং ইসলাম পরোপকারের পাশাপাশি প্রজ্ঞা, সতর্কতা ও আত্মরক্ষার শিক্ষাও দেয়।
আল্লাহ তাআলা কোনো নেককারের সৎকাজ বৃথা যেতে দেন না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার তাওফিক দিন এবং অন্যের অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও ভালো কাজের ওপর অবিচল থাকার ধৈর্য দান করুন। আমীন।
উত্তর: না, মানুষের অকৃতজ্ঞতার কারণে ভালো কাজ বন্ধ করা উচিত নয়। মুমিন মানুষের কাছে কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশায় নয়, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উপকার করে এবং এর পূর্ণ প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে।
উত্তর: রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং সদ্ব্যবহার জারি রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। পাশাপাশি একই মানুষের দ্বারা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত না হতে সতর্কতা ও প্রজ্ঞা অবলম্বন করার নির্দেশও রয়েছে।
উত্তর: মানুষের উপকার করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি নেক আমল। সহীহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে। এছাড়া একটি হাসান বর্ণনায় মানুষের মধ্যে উত্তম হওয়ার সঙ্গে মানুষের উপকার করার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। তাই মানুষের উপকার করা উচিত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, মানুষের প্রশংসা বা প্রতিদানের আশায় নয়।
পরোপকার ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এই দ্বীনী বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে আর্টিকেলটির লিংক আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।