আমাদের বাঙালি সমাজে যুগ যুগ ধরে এমন কিছু ধারণা বা নিয়ম প্রচলিত আছে, যা আমরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে আসছি। বিশেষ করে রাতে ঘর ঝাড়ু দেওয়া, সূর্যাস্তের পর নখ বা চুল কাটা, কিংবা বিছানায় বসে নখ কাটা নিয়ে বড়দের মুখে নানা রকম ভীতিমূলক কথা শোনা যায়। বলা হয়—এসব করলে নাকি সংসারে অভাব আসে, অমঙ্গল হয় কিংবা আয়ু কমে যায়! কিন্তু একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের জানা উচিত, এগুলো কি আসলেই ইসলামের কথা, নাকি কেবলই ভিত্তিহীন কুসংস্কার? আসুন আজ সমাজে প্রচলিত এমন ৫টি বড় কুসংস্কার এবং এই ব্যাপারে শরিয়তের আসল বিধান খুব পরিষ্কারভাবে জেনে নিই।
ইসলাম একটি যুক্তিপূর্ণ এবং সুন্দর জীবনব্যবস্থা। এখানে প্রতিটি আদেশ-নিষেধের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। ইসলামে কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। রাসুলুল্লাহ ﷺ সব ধরণের কুসংস্কার বিশ্বাস করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আসুন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা ৫টি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা যাক।
প্রচলিত কুসংস্কার: আমাদের সমাজে অনেকেরই ধারণা, মাগরিবের পর বা রাতে ঘর ঝাড়ু দিলে ঘরের 'লক্ষ্মী' চলে যায়, অর্থাৎ ঘর থেকে বরকত উঠে যায় এবং অভাব-অনটন দেখা দেয়।
ইসলামের আসল বিধান: এটি সম্পূর্ণ একটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া কুসংস্কার। ইসলামী শরিয়তে দিন বা রাত যেকোনো সময় ঘর পরিষ্কার বা ঝাড়ু দেওয়ার সম্পূর্ণ অনুমতি রয়েছে। বরং ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলেছে।
পেছনের আসল কারণ: প্রাচীনকালে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন রাতে কুপি বা হারিকেনের আলোতে ঘর ঝাড়ু দিলে মেঝের কোনো মূল্যবান জিনিস বা সুঁই-সুতো ধুলোবালির সাথে বাইরে চলে যাওয়ার ভয় থাকত। সেই বৈষয়িক ক্ষতি এড়াতেই প্রাচীনকালের মানুষ রাতে ঝাড়ু দিতে নিষেধ করত, যা কালক্রমে ধর্মীয় কুসংস্কারে রূপ নিয়েছে। আজ পর্যাপ্ত আলোর যুগে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো ভিত্তিই নেই।
প্রচলিত কুসংস্কার: অনেকে মনে করেন, মাগরিবের পর বা রাতে নখ, চুল ও দাড়ি কাটলে মা-বাবার আয়ু কমে যায় কিংবা ঘরে দারিদ্র্য নেমে আসে।
ইসলামের আসল বিধান: রাতে নখ বা চুল কাটার ব্যাপারে কুরআনে বা হাদিসে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় আপনি আপনার নখ বা চুল কাটতে পারেন, এতে কোনো গুনাহ বা অমঙ্গল হবে না।
পেছনের আসল কারণ: আগেকার দিনে ব্লেড বা আধুনিক নেইলকাটার ছিল না। মানুষ ছুরি বা ধারালো তরবারি দিয়ে নখ কাটত। অন্ধকার রাতে বা আবছা আলোতে ওভাবে নখ কাটতে গেলে হাত-আঙুল কেটে রক্তারক্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকত। তাই রাতে নখ কাটতে বারণ করা হতো। এখন নেইলকাটার ও লাইটের আলোতে রাতে নখ কাটায় কোনো বাধা নেই।
প্রচলিত কুসংস্কার: বলা হয়ে থাকে, ঘরের চৌকাঠে (দরজার নিচে) বসে কিংবা শোবার বিছানায় বসে নখ কাটলে সংসারে অমঙ্গল হয় এবং শয়তান ঘরে ভর করে।
ইসলামের আসল বিধান: শরিয়তের দৃষ্টিতে চৌকাঠ বা বিছানায় বসে নখ কাটলে কোনো গুনাহ নেই। তবে পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতার খাতিরে এমন জায়গায় নখ কাটা উচিত যেন নখের টুকরো মেঝেতে বা বিছানায় ছড়িয়ে না পড়ে। নখের টুকরোগুলো এক জায়গায় জড়ো করে ডাস্টবিনে বা মাটিতে ফেলে দেওয়া উত্তম।
প্রচলিত কুসংস্কার: সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন যেমন—মঙ্গলবার বা শনিবারে নখ বা চুল কাটলে নাকি অ্যাক্সিডেন্ট বা বড় কোনো বিপদ আপদ আসে।
ইসলামের আসল বিধান: ইসলামে কোনো দিন বা ক্ষণকে অশুভ বা অমঙ্গলের প্রতীক মনে করা সম্পূর্ণ হারাম। সপ্তাহের ৭টি দিনই আল্লাহর তৈরি এবং প্রতিটি দিনই বরকতময়। তবে জুমার দিন (শুক্রবার) জুমার নামাজের আগে নখ কাটা, গোসল করা এবং পরিচ্ছন্ন হওয়া সুন্নাহ। তাই নির্দিষ্ট কোনো দিনকে ভয়ের কারণ মনে করা যাবে না।
প্রচলিত কুসংস্কার: মাগরিবের আজান শুরু হলে ঘরের সব কাজ (যেমন রান্না বা অন্য কোনো কাজ) থামিয়ে একদম স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হবে, নইলে অমঙ্গল হবে।
ইসলামের আসল বিধান: আজানের সময় আজানের জবাব দেওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে আজান শোনা সুন্নাহ। কিন্তু আজান চলাকালীন কোনো হালাল কাজ করলে কোনো গুনাহ বা অমঙ্গল হয় না। তবে আজান শেষ হওয়ার পরপরই দুনিয়াবি কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে দ্রুত নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।
রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোনো অশুভ লক্ষণ বা কুসংস্কারে বিশ্বাস করা এক ধরণের শিরক (সুনানে আবু দাউদ)। তাই আমাদের সমাজে প্রচলিত এসব সস্তা ও ভিত্তিহীন ভয় থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। লাভ-ক্ষতি, ভালো-মন্দ এবং রিযিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা।
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, আমাদের ঘরের মা-বোন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভুল ধারণাগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। সমাজ থেকে এই অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করতে এবং ইসলামের সঠিক সুন্দর রূপটি সবার সামনে তুলে ধরতে আর্টিকেলটি এখনই আপনার ফেসবুক ওয়ালে বা ইসলামিক গ্রুপগুলোতে অবশ্যই শেয়ার করুন।