ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে ঈমান আনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক ইবাদত হলো সালাত (নামাজ)। সালাত কেবল কিছু শারীরিক অঙ্গভঙ্গির নাম নয়; বরং এটি বান্দা ও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর মাঝে সরাসরি যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম। একজন মানুষ মুখে নিজেকে মুসলিম দাবি করলেই প্রকৃত মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে নিয়মিত সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্যের সত্যতা প্রমাণ করে। পবিত্র কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ বারবার এসেছে এবং শেষ বিচারের দিনে সর্বপ্রথম সালাতেরই হিসাব গ্রহণ করা হবে। আসুন আজ পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে সালাতের অপরিহার্যতা, বেনামাজির পরিণতি এবং ইসলামের দৃষ্টিতে সালাতের অবস্থান জেনে নিই।
ইসলামের দৃষ্টিতে সালাত এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটিকে ঈমান ও কুফরের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণকারী প্রাচীর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে অলসতা গুনাহ হলেও সালাত সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা মানুষকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ অপরাধ।
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:
“নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তির মধ্যে এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে (পার্থক্যকারী মূল) ব্যবধান হলো সালাত ত্যাগ করা।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮২
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন:
“আমাদের এবং তাদের (মুনাফিক ও অমুসলিমদের) মাঝে চুক্তির মূল ভিত্তি হলো সালাত। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাত ছেড়ে দিল, সে যেন কুফরী করল।”
— সুনানে তিরমিজী, হাদিস: ২৬২১; শাইখ আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন মাজীদে কোনো একটি নির্দিষ্ট আমলের কথা এত বেশিবার উল্লেখ করেননি, যতবার সালাতের কথা নির্দেশ করেছেন। কুরআনের বহু স্থানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সালাত কায়েম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“আর তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৩
অন্য স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে সালাত আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মুমিনদের জন্য একটি আবশ্যকীয় ফরজ কাজ।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩
অনেকে সামান্য অলসতা, শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যস্ততার অজুহাতে সালাত কাজা করেন বা ছেড়ে দেন। অথচ ইসলামী শরীয়তে সালাত ত্যাগের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অবস্থা ও ব্যক্তির ক্ষেত্রে সালাত আদায়ের সরাসরি বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় রয়েছে:
একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো—আপনি কি এই চার শ্রেণীর কারও অন্তর্ভুক্ত? আপনি নিশ্চয়ই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু নন, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন পাগলও নন, আর পুরুষ হলে তো হায়েজ বা নেফাসের প্রশ্নই আসে না! এমনকি একজন মুসলিম হিসেবে আপনি অমুসলিমদের কাতারভুক্তও নন।
তাহলে একজন মুসলিম দাবিদার হয়ে আপনার বা আমার জন্য সালাত না পড়ার কী অজুহাত থাকতে পারে? এই বিশেষ অবস্থাগুলো ছাড়া সুস্থ-অসুস্থ, ধনী-দরিদ্র, মুসাফির-মুকিম, শান্তি কিংবা যুদ্ধের ময়দান—কোনো অবস্থাতেই প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মুসলিমের জন্য সালাত মাফ নেই। মানুষ দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে পড়বে, বসে পড়তে না পারলে শুয়ে ইশারায় সালাত আদায় করবে; এমনকি ওজু করার পানি না থাকলে তায়াম্মুম করে হলেও সালাত নির্ধারিত সময়েই আদায় করা আবশ্যক।
হাশরের ময়দানে মহা বিচার দিবসে বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামতের দিন একজন মুসলিম বান্দার যে আমলের সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো ফরজ সালাত। যদি সে তা পূর্ণভাবে আদায় করে থাকে, তবে তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি সে তা পূর্ণভাবে আদায় না করে থাকে, তখন বলা হবে: ‘দেখো, তার কোনো নফল সালাত আছে কি না।’ যদি তার নফল সালাত থাকে, তাহলে সেই নফল সালাত দ্বারা তার ফরজ সালাতের যে ঘাটতি হয়েছে তা পূর্ণ করা হবে। এরপর অন্যান্য ফরজ আমলের ক্ষেত্রেও একইভাবে করা হবে।”
— জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস: ৪১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪২৬
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কিয়ামতের দিন সালাতের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফরজ সালাতে কোনো ঘাটতি থাকলে নফল ইবাদতের মাধ্যমে তা পূরণের বিষয়ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআন মাজীদে জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মধ্যকার কথোপকথনের এক করুণ ও শিক্ষাভিমানী দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। জান্নাতের অধিবাসীরা জাহান্নামে কঠিন শাস্তিতে নিপতিত অপরাধীদের কাছে তাদের ধ্বংসের কারণ জানতে চাইবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেই দৃশ্য বর্ণনা করে বলেন:
“(জান্নাতীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে) 'কোন বিষয়টি তোমাদের সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে?' তারা (জাহান্নামীরা) জবাবে বলবে, 'আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না'...”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৪২-৪৩
চিন্তা করে দেখুন, জাহান্নামীরা তাদের কঠিন শাস্তির কারণ হিসেবে সর্বপ্রথমে যে পাপের কথা স্বীকার করবে, তা হলো নিয়মিত সালাত না পড়া বা মুসাল্লি না হওয়া।
একনিষ্ঠভাবে এবং সঠিক নিয়মে আদায় করা সালাত মানুষের চরিত্রকে ধোয়ামোছা করে খাঁটি করে তোলে। সালাত মানুষকে দৈনন্দিন জীবনের সব ধরণের পাপাচার ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে রাখে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪৫
সালাত কোনো বোঝা নয়, বরং এটি বান্দার জন্য আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার ও শান্তির আধার। আমরা যদি আমাদের জীবনকে আলোকিত করতে চাই, দুনিয়ার বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতে চাই এবং আখেরাতে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে স্থান পেতে চাই, তবে সালাত কায়েমের কোনো বিকল্প নেই।
যাদের অতীতে সালাতের ক্ষেত্রে অবহেলা হয়েছে, তাদের উচিত আজই খালেস নিয়তে তাওবা করে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সময়মতো আদায় করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক সালাত কায়েম করার তাওফিক দান করুন এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
উত্তর: ইসলামী শরীয়তে কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন (পাগল বা জ্ঞানহীন) ব্যক্তি এবং হায়েজ ও নেফাসকালীন নারীদের সালাত থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অমুসলিমদের ওপর ইসলাম গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত সালাতের সরাসরি বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই বিশেষ অবস্থাগুলো ছাড়া সুস্থ-অসুস্থ, ধনী-দরিদ্র বা যুদ্ধ-শান্তি কোনো অবস্থাতেই প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মুসলিমের জন্য সালাত ত্যাগের সুযোগ নেই।
উত্তর: কেয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে। ফরজ সালাতে কোনো ঘাটতি থাকলে নফল সালাতের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করার বিষয় হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর অন্যান্য ফরজ আমলের হিসাবও একইভাবে নেওয়া হবে। — জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস: ৪১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪২৬
উত্তর: পবিত্র কুরআনের সুরা আল-মুদ্দাসসির অনুযায়ী জান্নাতীদের প্রশ্নের জবাবে জাহান্নামীরা প্রথম উত্তর দেবে যে, তারা সালাত আদায়কারী (মুসাল্লি) ছিল না।
সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কিত এই দ্বীনী দাওয়াতটি আপনার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মাঝে পৌঁছে দিতে নিবন্ধের লিংকটি শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।