মানবজাতির অস্তিত্ব, পারিবারিক স্থায়িত্ব এবং সামাজিক প্রশান্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো নারী। কিন্তু বর্তমান সমাজে একটি প্রশ্ন বা সংশয় মাঝেমধ্যেই তৈরি হয়—ইসলামে নারী কি কেবলই ভালোবাসা ও প্রশান্তির নিয়ামত, নাকি পুরুষের ঈমান বিনষ্টকারী এক বড় ফিতনা? পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম এই বিষয়ে কোনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দেয়নি। নারী একদিকে যেমন পুরুষের জন্য মহান আল্লাহর অসামান্য নিয়ামত ও শান্তির আশ্রয়, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত আকর্ষণ ও বেপর্দা মেলামেশার কারণে তিনিই আবার পুরুষের ঈমানী পরীক্ষার (ফিতনা) প্রধান মাধ্যম। আসুন আজ পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের বিশুদ্ধ দলিলসহ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করি।
ইসলামে নারীকে কখনোই কোনো অপশক্তি, পাপের উৎস বা অশুভ বস্তু মনে করা হয় না। বরং মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীকে পুরুষের সহধর্মিণী ও মানসিক প্রশান্তির আধার বানিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি ও স্বস্তি লাভ করতে পারে।” — পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮৯
আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক কেবল শারীরিক নয়, বরং এটি আত্মিক প্রশান্তির সম্পর্ক। একজন পুণ্যবতী নারী একটি পরিবারকে জান্নাতী পরিবেশে রূপান্তর করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এই পৃথিবীর সর্বোত্তম নিয়ামতের বর্ণনায় নারীর মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন:
“সমগ্র পৃথিবীটাই সম্পদ ও সামগ্রী, আর পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো একজন পুণ্যবতী (নেককার) নারী।” — সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৮
অনেকে মনে করেন 'ফিতনা' শব্দের একমাত্র অর্থ গোলযোগ, ঝগড়া বা মন্দ কিছু। কিন্তু কুরআনিক ও হাদিসের পরিভাষায় ফিতনা (فتنة) শব্দের অন্যতম প্রধান অর্থ হলো—'পরীক্ষা', 'মান যাচাই' বা 'তীব্র আসক্তি'।
আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার অনেক প্রিয় ও নেয়ামতপূর্ণ বস্তুকে মানুষের জন্য পরীক্ষা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যেমন কুরআনে এসেছে, মানুষের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিও ফিতনা বা পরীক্ষা (সূরা আত-তাগাবুন: ১৫)। একইভাবে নারীদের প্রতি পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষণকেও আল্লাহ তাআলা একটি বিশাল পরীক্ষা হিসেবে রেখেছেন।
পবিত্র কুরআনে মানবমনস্তত্ত্বের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“মানবজাতির জন্য সুশোভিত করা হয়েছে কাম্য বস্তুসমূহের প্রতি ভালোবাসা—নারী, সন্তান-সন্ততি, সঞ্চিত স্বর্ণ-রৌপ্যের রাশি, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু এবং খেতখামার। এ সবই হলো পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনের স্থান।” — পবিত্র কুরআন, সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪
তাফসীরভিত্তিক অনুচিন্তন: দুনিয়ার যত আকর্ষণীয় ও আকর্ষণ সৃষ্টির মাধ্যম রয়েছে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার মধ্যে সর্বপ্রথমে 'নারী'-কে উল্লেখ করেছেন। কারণ, ধন-সম্পদ বা পদের চেয়েও পুরুষের মনকে বিচলিত করার এবং তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি হলো নারীর প্রতি আকর্ষণ।
পার্থিব আকর্ষণগুলোর মধ্যে যেন পুরুষরা নিজের চরিত্র ও ঈমান হারিয়ে না ফেলে, সে জন্য আল্লাহর রাসুল ﷺ বিশেষ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
হযরত উসামা বিন যায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আমার ইন্তেকালের পর পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর বা বড় কোনো ফিতনা (পরীক্ষা) আমি রেখে যাচ্ছি না।” — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪২
সঠিক অনুধাবন: এই হাদিস দিয়ে নারীকে খাটো করা হয়নি; বরং পুরুষের দুর্বলতাকে তুলে ধরা হয়েছে। পুরুষ স্বভাবগতভাবেই নারীর প্রতি দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শয়তান পুরুষকে ব্যভিচার, অবৈধ সম্পর্ক ও পাপে লিপ্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়।
আজকের ডিজিটাল যুগে বেপর্দা মেলামেশা, সোশ্যাল মিডিয়ার খোলামেলা ছবি-ভিডিও, পর্নোগ্রাফি এবং অবাধ সম্পর্কের কারণে এই ফিতনা চরম আকার ধারণ করেছে।
আল্লাহ তাআলা যেমন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তা থেকে বেঁচে থাকার এবং নিয়ামতকে সঠিকভাবে উপভোগ করার বৈধ ও সুন্দর পথও নির্দেশ করেছেন।
১. দৃষ্টি সংবরণ করা (Lowering the Gaze):
পাপের প্রথম দরজা হলো চোখ। আল্লাহ তাআলা পুরুষদের প্রথম নির্দেশ দিয়েছেন—“মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সূরা আন-নূর: ৩০)।
একইভাবে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা ও পবিত্রতা রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—“আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সূরা আন-নূর: ৩১)।
২. দ্রুত বিবাহের ব্যবস্থা করা:
চরিত্র রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্নাহসম্মত উপায় হলো বিবাহ। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ, তা দৃষ্টিকে সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করতে অধিক সহায়ক। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা পালন করে। কারণ, রোজা তার যৌন আকাঙ্ক্ষা দমন করার জন্য ঢালস্বরূপ।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৯০৫, ৫০৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০০
৩. রোজা পালন করা:
যার বিবাহের সামর্থ্য নেই, সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ রোজা যৌন আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার ঢালস্বরূপ।
৪. শালীনতা ও পর্দার বিধান বজায় রাখা:
নারী ও পুরুষ উভয়কেই নিজ নিজ পর্দার সীমানা মেনে চলা উচিত, যাতে সমাজে কোনো অনৈতিকতার পরিবেশ সৃষ্টি না হয়।
পরিশেষে বলা যায়, নারী স্বয়ং কোনো পাপ বা অপছন্দনীয় বস্তু নন। একজন নেককার স্ত্রী স্বামীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নিয়ামত এবং পারিবারিক প্রশান্তির মাধ্যম হতে পারেন। সূরা আল-আ‘রাফের ১৮৯ নম্বর আয়াতের আলোকে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পরস্পরের মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করা।
কিন্তু যখনই অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা চলাফেরা এবং অনিয়ন্ত্রিত আকর্ষণ রূপ নেয়, তখনই তা সুরা আল-ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতের আলোকে পুরুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন 'ফিতনা বা পরীক্ষার কারণ' হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পুরুষকে দৃষ্টিভঙ্গি সংযত রাখার তাওফিক দিন, নারী জাতিকে নিজেদের মর্যাদা ও পর্দার বিধান রক্ষা করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সবাইকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
উত্তর: না, কুরআনের পরিভাষায় 'ফিতনা' মানে হলো পরীক্ষা বা আসক্তি। সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং নারী—এ সবই আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ঈমান ও চরিত্র রক্ষার পরীক্ষা বা ফিতনা।
উত্তর: একদমই নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ নারীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলেছেন। ফিতনা বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পুরুষকে তার দৃষ্টি, মন ও চরিত্র সংযত রাখার বিষয়ে সতর্ক করা।
উত্তর: প্রথমত দৃষ্টি সংবরণ করা (চোখ নিচু রাখা), দ্বিতীয়ত সামর্থ্য থাকলে দ্রুত বিবাহ করা বা সিয়াম (রোজা) পালন করা, এবং শালীনতা ও পর্দার বিধান মেনে চলা।
ইসলামের এই সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ বার্তাটি আপনার বন্ধু ও পরিবারের সাথে শেয়ার করতে নিচের শেয়ার বাটনগুলোতে ক্লিক করে আর্টিকেলটি পৌঁছে দিন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।