বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর শুভ আগমন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যে সময় গোটা আরব সমাজ অন্যায়, অবিচার, পৌত্তলিকতা এবং জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই মহান আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেন। পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস আমাদের সেই চিরন্তন আলোকবর্তিকার আগমনকে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন আজ বিশুদ্ধ সীরাত গ্রন্থ ও সহীহ দলিলের আলোকে জেনে নিই প্রিয়নবী ﷺ-এর শুভ জন্মকাল, বংশমর্যাদা, শৈশবের লালন-পালন ও এতিম জীবনের অনুপম শিক্ষণীয় ইতিহাস।
মহানবী ﷺ-এর জন্মের প্রাক্কালে গোটা বিশ্বের ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থা ছিল চরম বিপর্যয়কর। মানুষ একত্ববাদ ভুলে পাথর, গাছপালা ও মূর্তির উপাসনায় মত্ত ছিল। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া, গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, দুর্বলদের শোষণ এবং ব্যভিচার ছিল সমাজের সাধারণ চিত্র।
মানবজাতির চরমতম সংকটের এই সময়ে মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী ﷺ-কে সত্য দ্বীন ও হেদায়েতের আলো দিয়ে প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন:
“আর আমি আপনাকে কেবল সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত বা পরম করুণাস্বরূপ প্রেরণ করেছি।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
তাঁর আগমন কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য ছিল না, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত সৃষ্টির জন্য ছিল এক অফুরন্ত শান্তির সুসংবাদ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। বংশপরম্পরায় তিনি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর।
তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা বিনতে ওহাব। আবদুল্লাহ ছিলেন কুরাইশ সর্দার আবদুল মুত্তালিবের সবচেয়ে প্রিয় ও কনিষ্ঠ পুত্র। নবীজি ﷺ মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তাঁর পিতা আবদুল্লাহ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে বাণিজ্য সফরে গিয়ে ইয়াসরিব (বর্তমান মদীনা মুনাওয়ারা)-এ ইন্তেকাল করেন। ফলে জন্ম থেকেই প্রিয়নবী ﷺ এতিম হিসেবে দুনিয়াতে আগমন করেন।
ঐতিহাসিকদের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী, বিশ্বনবী ﷺ ৫৭০ অথবা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। আরবদের ইতিহাসে এই বছরটি 'আমুল ফিল' (عام الفيل) বা হস্তী বর্ষ নামে খ্যাত।
নবীজি ﷺ-এর জন্মের মাত্র কিছুদিন আগে ইয়েমেনের খ্রিস্টান শাসক আবরাহা বিশাল একদল হাতি নিয়ে পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। মহান আল্লাহ অলৌকিকভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির (আবাবিল পাখি) মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপ করে আবরাহার বিশাল বাহিনীকে ভুষির মতো ধ্বংস করে দেন (যা সূরা আল-ফিলে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে)। এই ঘটনার মাধ্যমেই মক্কার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং একই বছর রহমতের নবীজি ﷺ-এর আগমন ঘটে।
জন্মের দিন: নবীজি ﷺ সোমবার দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আবু কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত:
“রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: এটি সেই দিন, যে দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর প্রথম ওহি নাজিল করা হয়েছে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২
প্রসিদ্ধ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ ঐতিহাসিকদের মতে, এই দিনটি ছিল হিজরি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ (কারও কারও মতে ৮ বা ৯ তারিখ)।
তৎকালীন আরবের অভিজাত কুরাইশদের একটি প্রচলন ছিল যে, নবজাতক শিশুদের বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শেখা এবং মরুভূমির মুক্ত হাওয়ায় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে গড়ে তোলার জন্য পল্লী অঞ্চলের ধাত্রী মায়েদের কাছে পাঠানো হতো।
মাতা আমিনা এবং আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবাহর দুধ পানের পর, বনু সাদ গোত্রের মহীয়সী নারী হালিমাতুস সাদিয়া (রা.) নবীজি ﷺ-কে নিজের বুকের দুধ পান ও লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।
হালিমাতুস সাদিয়ার ঘরে নবীজি ﷺ-এর আগমনের পর সেই চরম অভাবগ্রস্ত পরিবারে অলৌকিক বরকত শুরু হয়। তাঁদের দুর্বল উট ও ছাগলগুলো দুধে ভরে ওঠে এবং ফসলের প্রাচুর্য দেখা দেয়। বনু সাদ গোত্রে তিনি চার বছর বয়স পর্যন্ত অবস্থান করেন।
ধাত্রী হালিমার ঘরে অবস্থানকালেই ঘটে এক ঐতিহাসিক মুজিযা—নবীজির বক্ষ বিদারণ।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন শিশুদের সাথে খেলাধুলা করছিলেন, তখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর কাছে এলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে শোয়ালেন এবং তাঁর বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করলেন। এরপর হৃৎপিণ্ড থেকে একটি জমাট রক্তপিণ্ড বের করে বললেন, ‘এটি তোমার মধ্যকার শয়তানের অংশ।’ তারপর একটি স্বর্ণের পাত্রে জমজমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে আবার যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করলেন এবং বুক জোড়া লাগিয়ে দিলেন। এদিকে অন্য শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমাতার কাছে গিয়ে বলল, ‘মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে!’ তখন সবাই তাঁর কাছে ছুটে এলো এবং দেখল তিনি অত্যন্ত ভীত-বিহ্বল ও বিবর্ণ চেহারায় দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন: আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বুকের ওপর সেই সেলাইয়ের দাগ দেখেছি।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২, — মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস নম্বর: ৫৮৫২ আলবানী
এই অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনার পর ধাত্রী হালিমা এবং তাঁর স্বামী গভীরভাবে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, শিশু মুহাম্মদের হয়তো কোনো ক্ষতি বা বিপদ হতে পারে। তাই তাঁর নিরাপত্তার কথা গভীরভাবে চিন্তা করে তাঁরা আর কালবিলম্ব করেননি। অত্যন্ত সতর্কতা ও পরম ভালোবাসার সাথে চার বছর বয়সী শিশু মুহাম্মদ ﷺ-কে মক্কায় নিয়ে এসে তাঁর মমতাময়ী মা আমিনার নিরাপদ কোলে সোপর্দ করেন এবং পুরো ঘটনাটি তাঁর কাছে খুলে বলেন।
নবীজি ﷺ-এর শৈশব ছিল একের পর এক শোক ও কষ্টের মধ্য দিয়ে আল্লাহর অভিভাবকত্বে গড়ে ওঠার এক অনুপম অধ্যায়:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজির এই এতিম জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
“তিনি কি আপনাকে পিতৃহীন বা এতিম অবস্থায় পাননি, অতঃপর আপনাকে আশ্রয় দেননি?”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৬
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম ও শৈশবের ইতিহাস আমাদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়তম হাবীবকে কোনো রাজপ্রাসাদে বা রাজকীয় ঐশ্বর্যে বড় করেননি; বরং এতিম ও সাধারণ জীবনের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি দুঃখী, অসহায় মানুষের আদর্শ হিসেবে তৈরি করেছেন।
রবিউল আউয়াল মাস এলে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে আনন্দ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং নবীজি ﷺ-এর মহান চরিত্র, সততা, আমানতদারিতা এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধানকে নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বাস্তবায়ন করাই রাসূলের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার পরিচায়ক।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী ﷺ-এর জীবনের প্রতিটি দিক গভীরভাবে অধ্যয়ন করার এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর: রাসূলুল্লাহ ﷺ সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, সোমবার রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।'
উত্তর: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রধান দুধমাতা ছিলেন বনু সাদ গোত্রের মহীয়সী নারী হালিমা বিনতে আবু জুয়াইব (হালিমাতুস সাদিয়া)। এছাড়া মাতা আমিনার পর কিছুদিনের জন্য আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবাহও তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন।
উত্তর: যে বছর ইয়েমেনের শাসক আবরাহা কাবা ঘর ধ্বংসের জন্য বিশাল হস্তী বাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেছিল এবং আল্লাহ তাআলা ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি দিয়ে তাদের ধ্বংস করেছিলেন, সেই বছরকে আরবরা হস্তী বর্ষ বা আমুল ফিল বলে। এই ঐতিহাসিক বছরেই নবীজি ﷺ জন্মগ্রহণ করেন।
নবীপ্রেমের সহীহ বার্তা ও সীরাতুন্নবীর সঠিক ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে এই আর্টিকেলের লিংক আপনার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।