বর্তমান বিশ্বে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো পারস্পরিক অনৈক্য, দলাদলি ও বিভেদ। ভাষা, অঞ্চল, দল ও মতপার্থক্যের বেড়াজালে জড়িয়ে আজ মুসলিম উম্মাহ ছিন্নভিন্ন। অথচ ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন দলবাজিকে সমর্থন করে না; বরং গোটা জাতিকে একটি সুদৃঢ় পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে তাঁর রজ্জু শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকার দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ দিয়েছেন। আসুন আজ পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের প্রামাণ্য দলিলের আলোকে জেনে নিই—ইসলামের দৃষ্টিতে ঐক্যের মূল ভিত্তি কী, কেন বিভেদ বর্জন করা ফরজ এবং কীভাবে আমরা উম্মাহর মাঝে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, শত্রুর আঘাতের চেয়েও নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হিংসা-বিদ্বেষ জাতি হিসেবে আমাদের বেশি দুর্বল করে দিয়েছে। সামান্য গৌণ মতভেদের কারণে আমরা একে অপরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। অথচ ইসলামে মুমিনদের ঐক্য কোনো সাধারণ সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর আরোপিত এক মৌলিক ঈমানী দায়িত্ব।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের ঐক্যবদ্ধ থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো; যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে প্রীতি সঞ্চার করলেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩
‘আল্লাহর রজ্জু’ (হাবলুল্লাহ)-এর তাৎপর্য: তাফসীরবিদদের ব্যাখ্যায় ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে আল্লাহর দ্বীন, তাঁর কিতাব ও তাঁর নির্দেশিত পথকে বোঝানো হয়েছে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে কুরআন বুঝিয়েছেন। অন্য একটি বর্ণনায় তিনি এটিকে জামাআত বলেও ব্যাখ্যা করেছেন। তাই মুসলিমদের ঐক্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহর অনুসরণ।
“আল্লাহর রজ্জু হলো কুরআন।”
— আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.); তাফসীর আত-তাবারী, সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩, আসার নং: ৭৫৬৪
ঐক্য যেমন শক্তি বয়ে আনে, তেমনি বিভেদ জাতির মান-সম্মান ও প্রভাব ধ্বংস করে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পারস্পরিক বিরোধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন:
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
“আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৬
এই আয়াত আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। কোনো জাতি বা সম্প্রদায় সংখ্যায় যত বড়ই হোক, তাদের মধ্যে যদি পারস্পরিক বিরোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, দলাদলি ও বিভেদ সৃষ্টি হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের ঐক্য ও সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে তারা নিজেদের শক্তি, সাহস, মর্যাদা ও প্রভাব হারাতে থাকে। শুধু বাহ্যিক শক্তি নয়, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের আধ্যাত্মিক শক্তিকেও ক্ষয় করে দেয়। বিপরীতে, আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য একটি জাতিকে দৃঢ়, শক্তিশালী ও মর্যাদাবান করে তোলে। তাই মুসলিম উম্মাহর শক্তি কেবল সংখ্যাধিক্যে নয়; বরং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ওপর ঐক্যবদ্ধ থাকা, পরস্পরের অধিকার রক্ষা করা এবং বিভেদ ও বিবাদ থেকে দূরে থাকার মধ্যেই প্রকৃত শক্তি নিহিত।
ইসলাম মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঈমান ও ভ্রাতৃত্বের শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১০
হযরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিম উম্মাহর সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে বলেন:
“মুমিনদের পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত একটি মানবদেহের মতো; যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ আক্রান্ত বা ব্যথিত হয়, তখন পুরো দেহই অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬০১১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬
ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের মধ্যে কোনো কোনো ফিকহী ও ইজতিহাদী বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু এসব মতভেদ তাঁদের পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্বকে নষ্ট করেনি। তাঁরা বুঝতেন—যে বিষয়ে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, সেখানে তা মেনে নেওয়া অপরিহার্য; আর যে বিষয়ে দলিলের ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে, সেখানে ভিন্নমত হলেও পরস্পরকে সম্মান করা উচিত।
সুতরাং প্রত্যেক মতভেদকে বিভেদের কারণ বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়। মুসলিমদের উচিত আকীদা ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোতে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং বৈধ ইজতিহাদী মতভেদের ক্ষেত্রে সহনশীলতা, শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। মতের ভিন্নতা যেন হৃদয়ের শত্রুতায় পরিণত না হয়—এটাই ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১০
কুরআনের সেই চিরন্তন ঐক্যের ডাককে বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের করণীয় বিষয়সমূহ:
আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ, অহংকার ও অন্ধ দলপ্রীতি ভুলে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের ছায়াতলে একত্রিত হওয়া। ঐক্যবদ্ধ জাতি কখনোই পরাজিত হয় না; কিন্তু বিভক্ত জাতি নিজের ভুলেই বিলীন হয়ে যায়।
আসুন, সকল প্রকার বিভেদ ও সংকীর্ণতার দেওয়াল ভেঙে আমরা কুরআন-সুন্নাহর খাঁটি আদর্শে উজ্জীবিত হই এবং আল্লাহর নির্দেশিত সীমার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ জীবন গড়ে তুলি।
মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়গুলোকে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল করে দিন, আমাদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে দিন এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর: বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাফসীরবিদদের মতে, আল্লাহর রজ্জু হলো মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর প্রদর্শিত দ্বীন ইসলাম।
উত্তর: সূরা আল-আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হলে মুমিনরা সাহস হারাবে এবং তাদের শক্তি ও প্রভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে।
উত্তর: সহীহ হাদিস অনুযায়ী সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একটি মানবদেহের মতো; দেহের একটি অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে পুরো শরীর যেমন কষ্ট অনুভব করে, মুমিনদেরও একে অপরের দুঃখে একইভাবে এগিয়ে আসা উচিত।
মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এই অপরিহার্য বার্তাটি পৌঁছে দিতে আর্টিকেলটির লিংক আপনার পরিবার, পরিচিতজন ও বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।