মানুষকে অজ্ঞতা, ভুল ধারণা ও অন্ধ প্রথাপূজার হাত থেকে বাঁচিয়ে সত্যের পথ দেখানোই ইসলামের মূল কাজ। কিন্তু বর্তমান যুগে অনেক সময়ই আমরা দেখি—হাতে লেখা কোনো চিঠি, লোকমুখে শোনা গল্প কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে আসা না-জানা কোনো তথ্যকেই মানুষ অন্ধভাবে ইসলাম মনে করে বিশ্বাস করে বসে। এ পরিস্থিতিতে মনে প্রশ্ন আসতে পারে: ইসলাম কি আমাদের চোখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নিতে বলে, নাকি বিচার-বিবেচনা করে সত্য যাচাই করার শিক্ষা দেয়? আসুন, অত্যন্ত সহজ ভাষায় পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝে নিই।
আজকাল আমাদের চারপাশে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ কোনো চমকপ্রদ কথা বললেই বা কোনো ধর্মীয় পোশাক পরা মানুষকে দেখলেই মানুষ যাচাই করা ছাড়াই তার কথা মেনে নেয়। অনেকে আবার সামাজিক নানা কুসংস্কার ও পূর্বপুরুষদের পুরোনো নিয়মকানুনকেই ধর্মের অংশ বানিয়ে ফেলে।
কিন্তু ইসলাম কখনোই না বুঝে, না জেনে অন্ধের মতো কোনো কিছু গ্রহণ করতে বলে না। ইসলাম মানুষকে সঠিক জ্ঞান অর্জন ও সত্য যাচাই করে পথ চলার পথ দেখায়।
ইসলাম কখনো মানুষকে চোখ বুজে যেকোনো কথা মেনে নিতে বলে না। বরং ইসলাম মানুষকে বিবেকের ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে। যেকোনো কথা শোনার পর তা নিরপেক্ষভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে যা সত্য ও উত্তম, তা গ্রহণ করাই প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে, অতঃপর যা উত্তম তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১৮
আয়াতের গভীর ভাবার্থ ও শিক্ষণীয় দিক:
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কেবল কেউ এক কথা বললেই মুমিন তা অন্ধভাবে গ্রহণ করবে না। সে প্রথমে মনোযোগ দিয়ে বিষয়টি শুনবে, কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে, আর যা উত্তম ও সত্য—কেবল সেটিরই অনুসরণ করবে।
যখন কোনো বান্দা নিজে থেকে খাঁটি অন্তরে সঠিক জ্ঞান ও সত্য পথ পাওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ভালোবাসার সাথে তাকে সঠিক পথের দিশা (হেদায়েত) দান করেন। হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন—বান্দা যখন আল্লাহর দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আল্লাহ তার দিকে এক হাত এগিয়ে যান; আর বান্দা হেঁটে হেঁটে আল্লাহর পথ খোঁজার জন্য এলে আল্লাহ তাআলা তার দিকে দৌড়ে আসেন (সহীহ বুখারী: ৭৫৩৬)। আর আয়াতটিতে এই সত্য অনুসন্ধানকারীদেরই প্রকৃত 'বুদ্ধিমান' বলে ভূষিত করা হয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেকেই কোনো কথাকে খুব সুন্দর বা চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করলেই সাধারণ মানুষ তা সওয়াবের কাজ বা ধর্মীয় বিধান মনে করে পালন করা শুরু করে। অথচ ইসলামী শরীয়তের একটি অকাট্য মূলনীতি হলো—যেকোনো ইবাদত, আমল কিংবা আকিদা কেবল কারও মুখের কথায় গ্রহণযোগ্য হয় না; তার পেছনে অবশ্যই কুরআন বা সুন্নাহর নিশ্চিত প্রমাণ থাকতে হবে।
পবিত্র কুরআনে ভিত্তিহীন ও প্রমাণহীন দাবিদারদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন:
“বলুন, তোমরা যদি তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১১১
এই আয়াতটি আমাদের সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ইসলামে মনগড়া মতামত বা ধারণার কোনো মূল্য নেই। তাই ধর্মীয় নামে কোনো আমল, দোয়া বা ফজিলতের কথা শুনলেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে—আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহর সাথে এর সরাসরি কোনো ভিত্তি আছে কি না।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিদিন অজস্র তথ্য, খবর ও বক্তব্য ভাইরাল হয়। অনেক সময় ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে চমকপ্রদ কিন্তু ভিত্তিহীন গল্প বানিয়ে পোস্ট করা হয়। অসচেতনতার কারণে অনেকে না বুঝেই সেগুলো লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে সমাজে মারাত্মক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেন। অথচ ইসলামে যেকোনো সংবাদ পাওয়ার পর তা যাচাই ছাড়া গ্রহণ বা প্রচার করা কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের সতর্ক করে নির্দেশ দিয়েছেন:
“হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক (অবিশ্বস্ত বা অসৎ) ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে পরীক্ষা ও যাচাই করে নাও; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো, এবং পরবর্তীতে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬
এই সার্বজনীন বিধান আমাদের শেখায় যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট, উক্তি বা ভিডিও দেখলেই আবেগাপ্লুত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করা যাবে না। যতক্ষণ না নির্ভরযোগ্য সূত্র বা বিজ্ঞ আলেমদের মাধ্যমে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকাই ঈমানী দায়িত্ব।
অনেকে মনে করেন, “আমি তো আর নিজে বানিয়ে বলিনি, যা শুনেছি তা-ই শেয়ার করেছি—এতে আমার কী দোষ?” অথচ ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শোনা কথা যাচাই ছাড়া অন্যের কাছে বলে বেড়ানো বা প্রচার করা কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং এটি মানুষকে মিথ্যুকের স্তরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:
“কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা-ই শোনে (যাচাই-বাছাই ছাড়া) তা-ই মানুষের কাছে বলে বেড়ায়।”
— সহীহ মুসলিম (ভূমিকা), হাদিস: ৫
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই নির্দেশনা আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, কোনো কথা—তা দ্বীনি কোনো বক্তব্য হোক বা দুনিয়াবী কোনো সংবাদ—অন্যের কাছে প্রচার বা শেয়ার করার আগে তার সত্যতা ও নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। অনেক সময় আমরা কোনো তথ্য ভালো মনে করে বা নিছক আবেগের বশে প্রচার করে ফেলি, কিন্তু সেটি যদি ভুল বা বানোয়াট হয়, তবে অজান্তেই সেই ভুলের দায়ভার আমাদের কাঁধে এসে পড়ে। তাই কোনো তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে কিংবা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলে তা প্রচার না করে নীরব থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ ও তাকওয়াপূর্ণ পথ।
অতীতে যখনই পয়গম্বরগণ সত্যের দাওয়াত দিতেন, তখন কাফিররা বলত—"আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যে প্রথার ওপর পেয়েছি, আমরা তার ওপরই থাকব।"
পবিত্র কুরআনে তাদের এই ভুলের কথা তুলে ধরা হয়েছে:
“বরং তারা বলে, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের একটি নিয়মের ওপর পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি’।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ২২
ইসলাম শেখায় যে, বাপ-দাদা বা সমাজের পুরোনো কোনো ঐতিহ্য যদি কুরআন ও সহীহ হাদিসের বিপক্ষে যায়, তবে তা আঁকড়ে ধরে রাখা যাবে না। তবে হ্যাঁ, আমাদের আলেম ও পূর্বসূরীদের সুন্নাহসম্মত ভালো কাজকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে আলেমদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এখানেও ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার:
অনেকে ভুল বুঝে মনে করেন যে, না দেখে আল্লাহ বা পরকালের ওপর বিশ্বাস করাও নাকি অন্ধবিশ্বাস। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
১. অদৃশ্যে (গায়েবে) ঈমান:
আল্লাহ, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম ও পরকালের প্রতি আমাদের বিশ্বাস অন্ধ নয়। এটি কুরআনের অলৌকিক সত্যতা এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সত্য বিশ্বাস।
২. অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কার:
এখানে অন্ধবিশ্বাস বলতে এমন ধর্মীয় বিশ্বাস, আমল বা কুসংস্কার বোঝানো হচ্ছে, যার কোনো নির্ভরযোগ্য শরঈ ভিত্তি নেই এবং যা অনুমান, গুজব, কল্পকাহিনি বা মানুষের কথার ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা হয়। যেমন—
আমরা প্রতিনিয়ত যেসব ভুলের মুখোমুখি হই:
যেকোনো ধর্মীয় কথা শুনলে এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:
ইসলাম কেবল আবেগ কিংবা অন্ধ অনুকরণের নাম নয়; বরং এটি ওহি, সত্য জ্ঞান এবং বিবেকের আলোয় জীবন গড়ার পথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে চিন্তা করার ও সত্য চেনার শক্তি দিয়েছেন। তাই লোকমুখে শোনা কথা বা কুসংস্কারের পেছনে না ছুটে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোয় নিজেদের পথ পরিচালনা করাই একজন প্রকৃত মুসলিমের কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন, সত্যকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা দিন এবং সব ধরনের অন্ধবিশ্বাস থেকে দূরে রাখুন। আমীন।
উত্তর: না, এটি অন্ধবিশ্বাস নয়। আল্লাহ, ফেরেশতা ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস ওহির নিশ্চিত সত্যতা ও অকাট্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর অন্ধবিশ্বাস হলো প্রমাণ ছাড়া কাল্পনিক কুসংস্কার বা মানুষের কথায় না বুঝে বিশ্বাস করা।
উত্তর: একদমই নয়। যে বিষয়ে নিজে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা করে দ্বীন শেখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া: ৭)। তবে কোনো আলেম বা পীরকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যাবে না এবং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর স্পষ্ট বিধানের বিপরীতে কারও কথা গ্রহণ করা যাবে না।
উত্তর: যেকোনো ইসলামিক কথা দেখলে তা বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে রেফারেন্স এবং সহীহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত কি না তা যাচাই করা উচিত। সন্দেহ থাকলে শেয়ার না করাই উত্তম।
কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে সত্য যাচাই করে দ্বীনের এই দাওয়াত সবার মাঝে পৌঁছে দিন। নিবন্ধটির লিংক আপনার স্বজন ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।