বার্ধক্যে পিতা-মাতার অবহেলা: আপনার সন্তানও কি আপনার সাথে এমনটাই করবে?

বার্ধক্যে পিতা-মাতার অবহেলা ও সন্তানের করণীয়

যে পিতা-মাতা নিজেদের জীবনের সবটুকু সুখ, স্বপ্ন আর উপার্জনকে বিলিয়ে দিয়ে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই পিতা-মাতাই কেন আজ সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ? বার্ধক্যে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের অবহেলা কি কেবলই একটি সামাজিক ব্যাধি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে পরকালের চরম ধ্বংসের হাতছানি? আজ আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার সময় এসেছে— আমরা আজ আমাদের পিতা-মাতার সাথে যা করছি, আগামীকাল আমাদের সন্তানও কি আমাদের সাথে ঠিক এমনটাই করবে না?

শৈশবে আমাদের একটা সামান্য কষ্টের কারণে যে মা সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেননি, আর যে বাবা নিজের ছেঁড়া জুতো আর রোদে পোড়া শরীর নিয়ে আমাদের মুখে সেরা খাবারটা তুলে দিয়েছিলেন— আজ সেই মা-বাবার শরীর যখন বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছে, তখন আমাদের অনেকের কাছেই তারা ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

বর্তমান সমাজে ক্যারিয়ার, পরিবার আর আধুনিক লাইফস্টাইলের দোহাই দিয়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে একাকী করে রাখা, তাদের সাথে খিটখিটে মেজাজে কথা বলা কিংবা শেষ বয়সে তাদের ওল্ড এজ হোম বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু ইসলামে পিতা-মাতার স্থান কোথায়, আর তাদের এই অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব কতটা কঠিন, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?

১. পিতা-মাতার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ নির্দেশ

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজের ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়ার ঠিক পরপরই যে দায়িত্বটির কথা উল্লেখ করেছেন, তা হলো পিতা-মাতার প্রতি ইহসান বা উত্তম আচরণ করা।

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
“আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদয় আচরণ করবে।”
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৩

আল্লাহ তাআলা শুধু ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং বার্ধক্যের বিশেষ মুহূর্তে তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, তার একটি নিখুঁত সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

২. ‘উফ’ শব্দটিও কি তাদের কষ্ট দেয়?

বার্ধক্যে মানুষ সাধারণত শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে কিছুটা শিশুর মতো কোমল হয়ে পড়ে। তাদের এই স্বভাবগত পরিবর্তনের কারণে কখনো কখনো তারা একই কথা বারবার বলতে পারেন বা এমন কিছু চাইতে পারেন যা হয়তো আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে নাও হতে পারে। এই কঠিন সময়ে সন্তানের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয় ইসলাম।

إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا
“তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক নম্র কথা বলো।”
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৩

একটু ভেবে দেখুন, পিতা-মাতার কোনো আচরণে বিরক্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা বা মুখের ওপর ‘উফ’ বলা যেখানে আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, সেখানে তাদের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলা, তাদের গালাগাল করা বা অবহেলা করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে!

৩. জান্নাত পাওয়ার সবচেয়ে সহজ সুযোগ হারানো

অনেকে মনে করেন অনেক বেশি নফল ইবাদত, দান-সদকা বা হজের মাধ্যমেই কেবল জান্নাত নিশ্চিত করা যায়। অথচ ঘরের কোণে বসে থাকা বৃদ্ধ পিতা-মাতাই যে জান্নাতে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ও সহজ দরজা, তা আমরা ভুলে যাই।

সহীহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনবার আফসোস করে বললেন— “তার নাক ধুলাধূসরিত হোক (সে ধ্বংস হোক)!” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কে সে?” রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করলেন— “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, অথচ (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।” (সহীহ মুসলিম)

৪. বার্ধক্যে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের মূল করণীয়সমূহ

পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্বগুলো সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে যায়। ইসলাম আমাদের যে গাইডলাইন দেয়:

  • সময় ও মনোযোগ দেওয়া: শেষ বয়সে পিতা-মাতা সবচেয়ে বেশি একা বোধ করেন। শুধু টাকা-পয়সা বা ওষুধ কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের পাশে বসুন, তাদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনুন এবং তাদের একাকীত্ব দূর করুন।
  • আর্থিক ও শারীরিক দায়িত্ব নেওয়া: নিজের স্ত্রী-সন্তানের সুখের জন্য আমরা যেভাবে দুহাত উজাড় করে খরচ করি, ঠিক একইভাবে মা-বাবার প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • কণ্ঠস্বর নিচু রাখা: তাদের সামনে কখনো উচ্চস্বরে বা অহংকারের সুরে কথা বলা যাবে না। আল্লাহ বলেন— “আর তাদের প্রতি অনুকম্পায় বিনয়ের ডানা অবনমিত করো।” (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৪)
  • তাদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা: জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় মা-বাবার জন্য কুরআনে শেখানো সেই শ্রেষ্ঠ দোয়াটি আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা উচিত: “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা” (হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছিলেন)।

৫. কর্মের ফল দুনিয়াতেই ফেরত আসে

প্রকৃতির একটা চিরন্তন নিয়ম এবং আল্লাহর একটি বিশেষ বিধান হলো— আপনি আজ যা বপন করবেন, আগামীকাল ঠিক সেটাই কাটবেন। পিতা-মাতার অবহেলার শাস্তি আল্লাহ তাআলা পরকালের পাশাপাশি এই দুনিয়াতেই সন্তানকে দিয়ে থাকেন।

আপনি আজ আপনার বৃদ্ধ মা-বাবার সাথে যে অবহেলা বা নিষ্ঠুর আচরণ করছেন, তা দেখে দেখেই কিন্তু আপনার নিজের সন্তান বড় হচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই, আপনি যখন আজ থেকে ২০ বা ৩০ বছর পর ঠিক একই রকম বৃদ্ধ ও অসহায় হয়ে পড়বেন, আপনার সন্তানও আপনার সাথে ঠিক এই আচরণটুকুই ফিরিয়ে দেবে। তখন আফসোস করার আর কোনো পথ থাকবে না।

উপসংহার

পিতা-মাতা আমাদের জন্য কোনো সাধারণ আত্মীয় নন, তারা আমাদের দুনিয়াতে আসার মাধ্যম এবং আমাদের জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা। আমাদের কেরিয়ার, আমাদের ব্যস্ততা বা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন— কোনো কিছুই যেন এই পরম নিয়ামতকে অবহেলা করার অজুহাত না হয়ে দাঁড়ায়।

আসুন, আজই আমরা আমাদের মা-বাবার কাছে যাই, তাদের জড়িয়ে ধরি এবং আমাদের অতীতে হয়ে যাওয়া যেকোনো ছোট ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমাদের বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার সর্বোত্তম সেবা করার তাওফিক দান করুন এবং তাদের মাধ্যমে আমাদের জান্নাতকে সুনিশ্চিত করার ভাগ্য দান করুন। আমীন।

প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, আপনার একটি সাধারণ শেয়ার হতে পারে অন্য কোনো সন্তানের সচেতনতার কারণ। তাই সমাজের এই নীরব ব্যাধি দূর করতে এবং আমাদের পিতা-মাতাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আর্টিকেলটি অবশ্যই আপনার ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করুন।