আজকের যুগে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি, ভুল বোঝাবুঝি এবং ডিভোর্সের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বাইরে থেকে দেখতে নিখুঁত মনে হওয়া অনেক সংসারও ভেতরের একাকীত্ব আর মানসিক দূরত্বের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মানুষ সুখের সন্ধানে কতশত মোটিভেশনাল বই পড়ছে, থেরাপিস্টের কাছে যাচ্ছে; অথচ আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন একটি সুখী ও ভালোবাসাময় দাম্পত্য জীবনের আসল চাবিকাঠি কী। তিনি শুধু একজন মহান নেতা বা নবী ছিলেন না, বরং স্ত্রীদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, দয়ালু, সহানুভূতিশীল এবং উত্তম আচরণের এক অনন্য আদর্শ। আসুন আজ জেনে নিই স্ত্রীদের সাথে তাঁর আচরণ কেমন ছিল এবং কীভাবে আমরা আমাদের নিজেদের সংসারে সেই সুখ ফিরিয়ে আনতে পারি।
ইসলামে বিয়েকে কেবল একটি আইনি চুক্তি বলা হয়নি, বরং এটিকে দুটি আত্মার মাঝে প্রশান্তি ও ভালোবাসার এক স্বর্গীয় বন্ধন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ পরিষ্কার করে বলে গেছেন, একজন পুরুষের আসল চরিত্র প্রকাশ পায় তার স্ত্রীর সাথে তার ব্যবহারে। তিনি বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকট তোমাদের চেয়েও উত্তম।”
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫
আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, ঘরের সব কাজ কেবল নারীর একা। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহর রাসুল ﷺ ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি উত্তরে বলেন:
“তিনি ঘরের মানুষদের সেবামূলক কাজে (গৃহস্থালি কাজে) ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ ঘরের কাজকর্মে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। আর যখন নামাজের সময় হতো, তখন নামাজের জন্য চলে যেতেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৭৬)
তিনি নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি দিতেন এবং নিজের কাজ নিজে করতে কখনো দ্বিধা করতেন না। ঘরের কাজে স্ত্রীকে একটু সাহায্য করা যে কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং সুন্নাহ—এই মানসিকতা আজ আমাদের খুব প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে একই পাত্রে পানি পান করতেন। আয়েশা (রা.) পাত্রের যে অংশে মুখ রেখে পানি পান করতেন, রাসুল ﷺ ঠিক সেই অংশে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে পছন্দ করতেন (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০)। এমনকি তিনি আয়েশা (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৯৭)।
আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা সঙ্গীকে ভালোবাসি বলতেই ভুলে যাই। অথচ রাসুল ﷺ সাহাবিদের সামনেও দ্বিধাহীনভাবে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। সহীহ বুখারীর একটি হাদিসে এসেছে, নারীদের মধ্যে তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন হযরত আয়েশা (রা.) (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৬৬২)।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু গম্ভীর কোনো দায়িত্বের নাম নয়, এতে থাকা চাই আনন্দ ও প্রাণবন্ততা। রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে মরুভূমিতে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন! প্রথমবার আয়েশা (রা.) জিতে যান। এর বহু বছর পর আয়েশা (রা.)-এর শরীর একটু ভারী হয়ে গেলে তারা আবার দৌড়ান এবং এবার রাসুল ﷺ জিতে যান। তখন তিনি হেসে আয়েশা (রা.)-এর কাঁধে হাত দিয়ে বলেছিলেন, “এই জয়টি আগের হারের প্রতিশোধ।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দাম্পত্য জীবনে মাঝেমধ্যে হালকা রসিকতা এবং একসাথে সময় কাটানো মানসিক চাপ ও দূরত্ব অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
সংসার থাকলে মানুষের মধ্যে রাগ বা মান-অভিমান হবেই, এটাই স্বাভাবিক। রাসুল ﷺ-এর ঘরেও কখনো কখনো স্ত্রীদের মাঝে ঈর্ষা বা রাগ দেখা যেত। কিন্তু তিনি কখনো চড়াও হতেন না, চিৎকার করতেন না বা গালি দিতেন না। তিনি মুচকি হেসে পরিস্থিতি শান্ত করতেন।
রাসুল ﷺ আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, “তুমি কখন আমার ওপর খুশি থাকো আর কখন রাগ করে থাকো, তা আমি বুঝতে পারি।” আয়েশা (রা.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে? রাসুল ﷺ বললেন, “যখন তুমি খুশি থাকো তখন বলো ‘মুহাম্মদের রবের কসম’। আর যখন রেগে থাকো তখন বলো ‘ইব্রাহিমের রবের কসম’!” আয়েশা (রা.) হেসে স্বীকার করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি ঠিকই ধরেছেন, রাগের মাথায় আমি কেবল আপনার নামটিই মুখে নেওয়া থেকে বিরত থাকি, কিন্তু অন্তরে আপনার ভালোবাসা ঠিকই থাকে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫২২৮)।
একবার সফরে রাসুল ﷺ-এর স্ত্রী হযরত সাফিয়া (রা.) উটের ধীরগতির কারণে কাফেলা থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। রাসুল ﷺ যখন জানতে পারলেন, তিনি নিজে সাফিয়ার কাছে গেলেন এবং নিজের পবিত্র হাত দিয়ে সাফিয়ার চোখের পানি মুছে দিলেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিলেন (সুনানে নাসায়ী আল-কুবরা, হাদিস: ৯১৬৭; মুসনাদে আহমাদ)।
স্ত্রীর চোখের পানির মূল্য দেওয়া, তার ছোট ছোট আবেগকে অবহেলা না করে আগলে রাখা একজন আদর্শ স্বামীর বড় বৈশিষ্ট্য।
মনে রাখতে হবে, সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু স্বামীর একার নয়, বরং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহভীতি একটি সফল সংসারের মূল ভিত্তি। এখানে মূলত স্বামীদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামে দাম্পত্যের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে পারস্পরিক ছাড়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর। যদি আজ প্রতিটি মুসলিম স্বামী রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই সুন্দর ও কোমল আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে আমাদের সমাজ থেকে পারিবারিক কলহ দূর হয়ে প্রতিটি ঘর একটি শান্তির নীড়ে পরিণত হবে।
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, আধুনিক জীবনের ইগো এবং ব্যস্ততা ভুলে চলুন আমরা আমাদের পরিবারকে সুন্নাহর আলোয় সাজিয়ে তুলি। লেখাটি আপনার জীবনসঙ্গী বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দাম্পত্য জীবনের এই সুন্দর ম্যাসেজটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন।