কিয়ামতের ছোট ও বড় আলামতসমূহ: সহীহ হাদিস ও বর্তমান সময়ের বাস্তবতা

কিয়ামতের ছোট ও বড় আলামতসমূহ এবং বর্তমান সময়ের বাস্তবতা

বিশ্বজগতের সূচনা যেমন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে হয়েছে, তেমনি এর সমাপ্তিও ঘটবে এক অনিবার্য মহাঘটনার মধ্য দিয়ে, যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘কিয়ামত’ বলা হয়। কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে তার চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই সংরক্ষিত। তবে দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ উম্মতকে সতর্ক ও সচেতন করার উদ্দেশ্যে কিয়ামতের বহু লক্ষণ বা আলামতের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে গেছেন। বর্তমান যুগে ঘটে যাওয়া সামাজিক, নৈতিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের দিকে তাকালে হাদিসের সেই ভবিষ্যৎবাণীগুলোর নিখুঁত সত্যতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। আসুন কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিয়ামতের ছোট ও বড় আলামতগুলো এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবতা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

১. কিয়ামতের জ্ঞান ও কোরআনের ঘোষণা

কিয়ামতের সুনির্দিষ্ট সময়কাল সৃষ্টিজগতের কারোরই জানা নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন:

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ

“তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, তা কখন ঘটবে? বলে দিন, এর জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকের কাছেই রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা প্রকাশ করতে পারবে না।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৮৭

কিয়ামতের সঠিক ক্ষণ গোপন রাখার উদ্দেশ্য হলো যেন প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে পরকালের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং সৎকাজে নিয়োজিত থাকে।

২. কিয়ামতের ছোট আলামতসমূহ (আলামাতুস সুগরা)

কিয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অধিকাংশই ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে অথবা বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সহীহ হাদিসসমূহে বর্ণিত উল্লেখযোগ্য কিছু আলামত নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • নবীজি ﷺ-এর আগমন ও ওফাত:
    রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি প্রদর্শন করে বলেছিলেন:
    “আমার আগমন ও কিয়ামত এই দুটি আঙুলের মতো কাছাকাছি।”
    — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৫০৪
  • অযোগ্যদের হাতে দায়িত্ব অর্পণ ও আমানতের খেয়ানত:
    এক ব্যক্তি যখন কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, তখন নবীজি ﷺ বললেন: “যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করো।” সাহাবী বললেন, “আমানত কীভাবে নষ্ট হবে?” নবীজি ﷺ বললেন: “যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হবে, তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করো।” (সহীহ বুখারী: ৫৯)
  • সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরির প্রতিযোগিতা:
    হাদিসে জিবরীলে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ﷺ বলেছেন: “যখন দেখবে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র মেষপালকেরা সুউচ্চ দালানকোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, তখন জানবে কিয়ামত সন্নিকটে।” (সহীহ মুসলিম: ৮)
  • ইলম উঠে যাওয়া ও অজ্ঞতার প্রসার:
    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ হলো জ্ঞান বা দ্বীনি ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়বে, ব্যভিচার বেড়ে যাবে এবং মদ্যপান বৃদ্ধি পাবে।” (সহীহ বুখারী: ৮০)
  • সময়ের বরকত হ্রাস পাওয়া:
    হাদিস শরিফে এসেছে: “কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না যতক্ষণ না সময় সংকুচিত হয়ে আসবে; একটি বছর এক মাসের মতো মনে হবে, এক মাস এক সপ্তাহের মতো এবং এক সপ্তাহ একদিনের মতো দ্রুত অতিবাহিত হবে।” (জামে তিরমিযী: ২৩৩২)
  • হত্যাকাণ্ড ও অরাজকতা বৃদ্ধি (হারাজ):
    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কিয়ামতের পূর্বে এমন যুগ আসবে যখন হারাজ বৃদ্ধি পাবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হারাজ কী?” তিনি বললেন: “ব্যাপক হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারী জানবে না সে কেন হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না তাকে কেন হত্যা করা হয়েছে।” (সহীহ মুসলিম: ২৯০৮)

৩. কিয়ামতের বড় আলামতসমূহ (আলামাতুল কুবরা)

বড় আলামতগুলো হলো এমন কিছু অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা, যা কিয়ামতের একেবারেই শেষ প্রান্তে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হবে। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে ১০টি প্রধান আলামত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:

হযরত হুযাইফা ইবনে আসীদ আল-গিফারী (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ আমাদের লক্ষ্য করে বললেন: “দশটি লক্ষণ প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না—১. ধোঁয়া (দুখান), ২. দাজ্জালের আবির্ভাব, ৩. দাব্বাতুল আরদ (বিশেষ প্রাণী), ৪. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ৫. ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর অবতরণ, ৬. ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ, ৭. পূর্বে ভূমিধস, ৮. পশ্চিমে ভূমিধস, ৯. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস, এবং ১০. সর্বশেষে ইয়েমেন থেকে নির্গত এক বিশাল আগুন যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে একত্র করবে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯০১

এই বড় লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় হওয়ার পর কোনো তওবা আর কবুল করা হবে না।

৪. বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

আজকের সমকালীন পৃথিবীর দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায় যে, চৌদ্দশত বছর পূর্বে নবীজি ﷺ কিয়ামতের যেসব ছোট আলামত ও সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার প্রায় প্রতিটিই আমাদের চোখের সামনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হচ্ছে:

  • সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়: পিতা-মাতার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে পারিবারিক বন্ধন আজ চরম সংকটে।
  • অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের বিস্তার: ডিজিটাল মাধ্যম ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা আজ সহজলভ্য হয়ে পড়েছে, যা সমাজে নীতিহীনতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
  • সময়ের বরকত হ্রাস ও অনর্থক ব্যস্ততা: প্রযুক্তির অতিরিক্ত আসক্তি ও বস্তুবাদী জীবনযাপনের কারণে দিন-মাস কীভাবে চোখের পলকে পার হয়ে যাচ্ছে তা মানুষ টেরই পাচ্ছে না।
  • অর্থনৈতিক শোষণ ও সুদের ব্যাপকতা: হালাল-হারামের ভেদাভেদ ভুলে সুদ, ঘুষ, মজুদদারি ও প্রতারণামূলক লেনদেন আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল কাঠামোর মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
  • অকারণ রক্তপাত ও বিশ্বজুড়ে অরাজকতা: তুচ্ছ কারণে কিংবা রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড প্রতিনিয়ত ঘটছে।

বাস্তবতার এই করুণ চিত্র প্রমাণ করে যে আমরা আখেরি যামানার অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে বাস করছি, যেখানে ঈমান ধরে রাখা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের তালুতে রাখার মতোই কঠিন।

এই ফেতনার যুগে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

  • কুরআন ও সুন্নাহর ওপর অটল থাকা: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর মতবাদ পরিহার করে বিশুদ্ধ সুন্নাহর অনুসরণ করা।
  • সুরা আল-কাহাফ নিয়মিত তিলাওয়াত: প্রতি জুমুআয় সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা এবং বিশেষ করে এর প্রথম ও শেষ দশ আয়াত মুখস্থ রাখা, যা দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার প্রধান ঢাল (সহীহ মুসলিম: ৮০৯)।
  • খাঁটি দিলে তওবা ও ইস্তিগফার: জীবনের সব পাপ থেকে তাওবা করে নেক আমলে আত্মনিয়োগ করা।
  • হালাল উপার্জন ও ঋণমুক্ত থাকা: আর্থিক জীবনে সুদ ও হারাম বর্জন করে অল্পে তুষ্টি অর্জন করা।

উপসংহার: আখেরাতের অনন্ত প্রস্তুতি

কিয়ামতের আলামত জানার মূল উদ্দেশ্য কেবল ভবিষ্যৎবাণী মিলিয়ে দেখা বা ভীতি ছড়ানো নয়; বরং এর আসল উদ্দেশ্য হলো অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করা এবং আখেরাতের সম্বল প্রস্তুত রাখা। মৃত্যু হলো মানুষের ব্যক্তিগত কিয়ামত। তাই মহাজাগতিক কিয়ামত আসার আগেই নিজের আত্মশুদ্ধি অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের আখেরি যামানার যাবতীয় ফেতনা থেকে হেফাজত করুন, ঈমানের ওপর অবিচল রাখুন এবং পরকালে সফলকামদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: কিয়ামতের আলামত বা লক্ষণ কয় ভাগে বিভক্ত?

উত্তর: কিয়ামতের লক্ষণসমূহ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—ছোট আলামত (আলামাতুস সুগরা) এবং বড় আলামত (আলামাতুল কুবরা)। ছোট আলামতগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়, আর বড় আলামতগুলো কিয়ামতের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।

প্রশ্ন ২: কিয়ামতের প্রধান ১০টি বড় আলামত কী কী?

উত্তর: সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী প্রধান ১০টি বড় আলামত হলো: ধোঁয়া (দুখান), দাজ্জালের আবির্ভাব, দাব্বাতুল আরদ (ভূগর্ভস্থ প্রাণী), পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ঈসা (আ.)-এর আগমন, ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ, পূর্ব-পশ্চিম ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ভূ-ধস, এবং ইয়েমেন থেকে অগ্নুৎপাত যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নেবে।

প্রশ্ন ৩: দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার জন্য কোন সুরার আমল করতে বলা হয়েছে?

উত্তর: সহীহ হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত (অথবা শেষ দশ আয়াত) মুখস্থ ও তিলাওয়াত করবে, সে দাজ্জালের ভয়াবহ ফেতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

আখেরি যামানার ফেতনা থেকে বেঁচে থাকার এই জরুরি ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তাটি আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।