বিশ্বজগতের সূচনা যেমন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে হয়েছে, তেমনি এর সমাপ্তিও ঘটবে এক অনিবার্য মহাঘটনার মধ্য দিয়ে, যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘কিয়ামত’ বলা হয়। কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে তার চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই সংরক্ষিত। তবে দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ উম্মতকে সতর্ক ও সচেতন করার উদ্দেশ্যে কিয়ামতের বহু লক্ষণ বা আলামতের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে গেছেন। বর্তমান যুগে ঘটে যাওয়া সামাজিক, নৈতিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের দিকে তাকালে হাদিসের সেই ভবিষ্যৎবাণীগুলোর নিখুঁত সত্যতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। আসুন কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিয়ামতের ছোট ও বড় আলামতগুলো এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবতা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
কিয়ামতের সুনির্দিষ্ট সময়কাল সৃষ্টিজগতের কারোরই জানা নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন:
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ
“তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, তা কখন ঘটবে? বলে দিন, এর জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকের কাছেই রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা প্রকাশ করতে পারবে না।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৮৭
কিয়ামতের সঠিক ক্ষণ গোপন রাখার উদ্দেশ্য হলো যেন প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে পরকালের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং সৎকাজে নিয়োজিত থাকে।
কিয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অধিকাংশই ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে অথবা বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সহীহ হাদিসসমূহে বর্ণিত উল্লেখযোগ্য কিছু আলামত নিচে উল্লেখ করা হলো:
“আমার আগমন ও কিয়ামত এই দুটি আঙুলের মতো কাছাকাছি।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৫০৪
বড় আলামতগুলো হলো এমন কিছু অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা, যা কিয়ামতের একেবারেই শেষ প্রান্তে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হবে। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে ১০টি প্রধান আলামত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:
হযরত হুযাইফা ইবনে আসীদ আল-গিফারী (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ আমাদের লক্ষ্য করে বললেন: “দশটি লক্ষণ প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না—১. ধোঁয়া (দুখান), ২. দাজ্জালের আবির্ভাব, ৩. দাব্বাতুল আরদ (বিশেষ প্রাণী), ৪. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ৫. ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর অবতরণ, ৬. ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ, ৭. পূর্বে ভূমিধস, ৮. পশ্চিমে ভূমিধস, ৯. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস, এবং ১০. সর্বশেষে ইয়েমেন থেকে নির্গত এক বিশাল আগুন যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে একত্র করবে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯০১
এই বড় লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় হওয়ার পর কোনো তওবা আর কবুল করা হবে না।
আজকের সমকালীন পৃথিবীর দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায় যে, চৌদ্দশত বছর পূর্বে নবীজি ﷺ কিয়ামতের যেসব ছোট আলামত ও সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার প্রায় প্রতিটিই আমাদের চোখের সামনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হচ্ছে:
বাস্তবতার এই করুণ চিত্র প্রমাণ করে যে আমরা আখেরি যামানার অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে বাস করছি, যেখানে ঈমান ধরে রাখা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের তালুতে রাখার মতোই কঠিন।
এই ফেতনার যুগে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
কিয়ামতের আলামত জানার মূল উদ্দেশ্য কেবল ভবিষ্যৎবাণী মিলিয়ে দেখা বা ভীতি ছড়ানো নয়; বরং এর আসল উদ্দেশ্য হলো অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করা এবং আখেরাতের সম্বল প্রস্তুত রাখা। মৃত্যু হলো মানুষের ব্যক্তিগত কিয়ামত। তাই মহাজাগতিক কিয়ামত আসার আগেই নিজের আত্মশুদ্ধি অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের আখেরি যামানার যাবতীয় ফেতনা থেকে হেফাজত করুন, ঈমানের ওপর অবিচল রাখুন এবং পরকালে সফলকামদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
উত্তর: কিয়ামতের লক্ষণসমূহ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—ছোট আলামত (আলামাতুস সুগরা) এবং বড় আলামত (আলামাতুল কুবরা)। ছোট আলামতগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়, আর বড় আলামতগুলো কিয়ামতের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।
উত্তর: সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী প্রধান ১০টি বড় আলামত হলো: ধোঁয়া (দুখান), দাজ্জালের আবির্ভাব, দাব্বাতুল আরদ (ভূগর্ভস্থ প্রাণী), পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ঈসা (আ.)-এর আগমন, ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ, পূর্ব-পশ্চিম ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ভূ-ধস, এবং ইয়েমেন থেকে অগ্নুৎপাত যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নেবে।
উত্তর: সহীহ হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত (অথবা শেষ দশ আয়াত) মুখস্থ ও তিলাওয়াত করবে, সে দাজ্জালের ভয়াবহ ফেতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
আখেরি যামানার ফেতনা থেকে বেঁচে থাকার এই জরুরি ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তাটি আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।