মানুষ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন, ধন-সম্পদ, লোভ-লালসা এবং সাময়িক আনন্দের মোহে পড়ে কত সহজেই না আখিরাতের চিরস্থায়ী বাস্তবতাকে ভুলে যায়! কিন্তু এই পৃথিবীর জীবন চিরদিনের নয়। একদিন হঠাৎ মৃত্যুর ডাক আসবে, আর তার পরপরই শুরু হবে শেষ বিচার বা কিয়ামতের মহা দিন। সেই দিন যখন প্রতিটি মানুষের ভালো-মন্দ আমলের হিসাব সামনে তুলে ধরা হবে, তখন সত্যকে অমান্যকারী, পাপী ও অবহেলাকারী মানুষেরা এমন চরম অনুশোচনা ও আফসোসে লিপ্ত হবে, যার কোনো সীমা থাকবে না। সেদিন তারা নিদারুণ কষ্টে চিৎকার করে কান্না করবে এবং বারবার দুনিয়াতে ফিরে আসার আকুতি জানাবে। কিন্তু আফসোস! সেদিন আর কোনো তাওবা বা ক্ষমার সুযোগ থাকবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের সেই অপরাধীদের আফসোসের কথাগুলো অত্যন্ত নিখুঁত ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন, যাতে আমরা বেঁচে থাকতেই সতর্ক হতে পারি। আসুন আজ কুরআনে বর্ণিত ১২টি আফসোস ও হাহাকারের বিবরণ জেনে নিই।
দুনিয়াতে একজন মানুষের চরিত্র, চিন্তাভাবনা ও জীবনধারা গঠনে তার বন্ধু ও সঙ্গীদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। অনেক মানুষ নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং খারাপ বন্ধু ও অসৎ পরিবেশের প্রভাবে ধীরে ধীরে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। তারা সালাত, কুরআন ও নেক আমলের পরিবর্তে গুনাহ ও অবাধ্যতার পথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন সত্য প্রকাশিত হবে এবং সেই বন্ধুরা একে অপরের কোনো উপকার করতে পারবে না, তখন তারা চরম অনুশোচনায় নিজের হাত কামড়ে আফসোস করতে থাকবে।
"হায়! যদি আমি রাসূলের পথ অবলম্বন করতাম। হায়! যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২৭–২৯
সেদিন তারা উপলব্ধি করবে যে, যার সঙ্গে দুনিয়াতে বন্ধুত্ব করে তারা গর্ববোধ করত, সেই বন্ধুই তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ, কুরআনের শিক্ষা এবং রাসূল ﷺ-এর অনুসরণ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ভয়াবহ দিনে অনুশোচনা, কান্না কিংবা একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো লাভ হবে না। তাই দুনিয়াতেই এমন সঙ্গী নির্বাচন করা উচিত, যারা আল্লাহভীতি, নেক আমল ও উত্তম চরিত্রের পথে চলতে একে অপরকে সাহায্য করে।
দুনিয়ার ব্যস্ততায় অনেকেই আল্লাহর ফরয ইবাদত বর্জন করেন এবং ভাবেন পরে তাওবা করবেন। কিন্তু হাশরের ময়দানে নিজের খালি আমলনামা দেখে তারা চিৎকার করে উঠবে:
"হায়! আল্লাহর ব্যাপারে আমার যে অবহেলা হয়েছে..."
"যদি আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দিতেন..."
"যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম..."
— পবিত্র কুরআন, সূরা যুমার, আয়াত: ৫৬-৫৯
"হায়! যদি আমি আমার এ জীবনের জন্য কিছু আগে পাঠাতাম।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ২৩-২৪
মানুষ বুঝতে পারবে যে, আসল জীবন তো পরকালের জীবন, অথচ সেই চিরস্থায়ী জীবনের জন্য তারা দুনিয়া থেকে কোনো ভালো আমল পাঠিয়ে আসেনি।
কিয়ামতের দিন যখন অপরাধী ও পাপীদের বাম হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তখন তারা তাদের কৃতকর্মের বীভৎস দৃশ্য দেখে শিউরে উঠবে। জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি যখন চোখের সামনে ভেসে উঠবে, তখন তারা নিজের অস্তিত্বকেই সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চাইবে এবং চরম হতাশায় দগ্ধ হয়ে বলবে:
“হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামাই না দেওয়া হতো! আর আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব কী! হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ পরিণতি হতো (আমি যদি আর কখনো জীবিত না হতাম)! আমার ধন-সম্পদ আজকে আমার কোনো কাজেই এলো না! আমার সমস্ত ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি আজ ধ্বংস হয়ে গেল!”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ২৫-২৯
দুনিয়াতে যে ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও অহংকারের পেছনে মানুষ অন্ধ হয়ে ঘুরেছিল, হাশরের দিন সেই সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। এরপর যখন পশু-পাখিদের হিসাব শেষ করে মহান আল্লাহ তাদের মাটিতে পরিণত হওয়ার নির্দেশ দেবেন, তখন কাফের ও পাপীরা হাহাকার করে উঠবে। তারা পশুপাখিদের দেখে চরম ঈর্ষা করবে এবং আফসোস করে বলবে:
“হায়! আমি যদি (মানুষ না হয়ে) মাটি হয়ে যেতাম!”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নাবা, আয়াত: ৪০
পশু-পাখিদের আর কোনো শাস্তি ভোগ করতে হবে না দেখে কাফেররা ব্যাকুল হয়ে কামনা করবে যে, তারা যদি দুনিয়াতেই মাটির সাথে মিশে যেত অথবা হাশরের মাঠে মাটির মতো অস্তিত্বহীন হয়ে যেত, তবে আজ এই কঠিন ও চিরস্থায়ী আযাবের মুখোমুখি হতে হতো না!
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সত্য গ্রহণের জন্য বিবেক, শ্রবণশক্তি এবং সঠিক-ভুল বোঝার ক্ষমতা দান করেছেন। পাশাপাশি তিনি নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং কুরআনের মাধ্যমে হিদায়াতের পথ সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু যারা অহংকার, অবহেলা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের ভয়াবহ পরিণতি দেখে গভীর অনুশোচনায় স্বীকার করবে যে, দোষ তাদেরই ছিল।
"যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১০
সেদিন তারা স্বীকার করবে যে, দুনিয়াতে আল্লাহর আয়াত তাদের সামনে পাঠ করা হয়েছিল, সত্যের আহ্বান তাদের কাছে পৌঁছেছিল এবং তারা চিন্তা করার সুযোগও পেয়েছিল। কিন্তু তারা সত্যকে গ্রহণ না করে নিজেদের প্রবৃত্তি ও ভুল বিশ্বাসের অনুসরণ করেছিল। তাই তাদের এই অনুশোচনা কোনো উপকারে আসবে না; কারণ পরীক্ষার সময় তখন শেষ হয়ে যাবে এবং আমলের দরজাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
হাশরের ময়দানে বিচার শেষে যখন ফায়সালা হয়ে যাবে, তখন অপরাধীরা মহান আল্লাহর দরবারে আকুতি জানিয়ে বারবার দুনিয়াতে ফিরে আসার সুযোগ চাইবে, যেন তারা কেবল নেক আমল করতে পারে।
"হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, আয়াত: ৯৯-১০০
"ফিরে যাওয়ার কি কোনো পথ আছে?"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪৪
"হায়! যদি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হতো, তবে আমরা আমাদের রবের আয়াতসমূহ অস্বীকার করতাম না।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আনআম, আয়াত: ২৭-২৮
"হে আমাদের রব! আমরা দেখেছি ও শুনেছি; এখন আমাদের ফিরিয়ে দিন, আমরা সৎকাজ করব।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা সেজদা, আয়াত: ১২
কিন্তু মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ ঘোষণা জানিয়ে দেবেন যে, তাদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, এখন আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই।
কিয়ামতের দিনের এই ভয়াবহ আফসোস ও হাহাকার কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি শতভাগ নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নিঃশ্বাস এখনও চলছে এবং আমরা এখনও জীবিত আছি। তাই সেই কঠিন দিনের আফসোস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আজই আমাদের নিচের ৪টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
উত্তর: মৃত্যুর পর যখন পরকালের অকাট্য সত্য ও জাহান্নামের আযাব সামনে ভেসে উঠবে, তখন অপরাধীরা তাদের কৃতকর্মের পরিণতি দেখতে পাবে। তাই তারা নেক আমল করা ও ঈমান আনার উদ্দেশ্যে আরেকবার সুযোগ চেয়ে দুনিয়াতে ফিরে আসার আকুতি জানাবে, কিন্তু সেই সুযোগ আর দেওয়া হবে না।
উত্তর: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফুরকানে (আয়াত: ২৭-২৯) বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন অপরাধী নিজের হাত কামড়ে আফসোস করে বলবে— হায়! আমি যদি রাসুলের পথ অবলম্বন করতাম এবং অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! কারণ সেই অসৎ বন্ধুই তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছিল।
উত্তর: মৃত্যুর আগেই সময়কে মূল্যায়ন করা, খালেস মনে তাওবা করা, কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়া এবং অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ ও ধার্মিক মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করাই পরকালের চরম আফসোস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।
মৃত্যুর পরের আফসোস কেবল চোখের পানি আর হাহাকার বাড়াবে, কিন্তু কোনো উপকারে আসবে না। আজ আমাদের হাতে সুযোগ আছে, চোখ মেললেই চারপাশের সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাচ্ছি, হাত-পা নাড়াতে পারছি—তাই এই মুহূর্তটিই হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার উপযুক্ত সময়। আসুন, পরকালের সেই বিষাদময় আফসোসে লিপ্ত হওয়ার আগেই আমরা আমাদের জীবনকে ঈমান ও আমল দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কিয়ামতের দিনের চরম আফসোস ও হাহাকার থেকে রক্ষা করুন এবং মৃত্যুর পূর্বেই খাঁটি তাওবা ও হেদায়েতের ওপর জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
মানুষকে পরকালের সচেতনতা বৃদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির বার্তা পৌঁছে দিতে এই হৃদয়স্পর্শী কুরআনিক গাইডলাইনটি আপনার প্রিয়জন ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। জাজাকাল্লাহু খাইরান।