রিজিক বৃদ্ধির ১০টি আমল ও বরকত লাভের উপায়

রিজিক ও বরকত

রিজিক কেবল টাকা-পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুস্বাস্থ্য, নেক সন্তান, মানসিক শান্তি এবং সময়—এসবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি কিছু বিশেষ আমল মানুষের উপার্জনে অভাবনীয় বরকত এনে দেয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে রিজিক বৃদ্ধির সেই ১০টি কার্যকরী আমল সম্পর্কে জানুন।

এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই চায় তার উপার্জনে বরকত হোক, সংসারে অভাব-অনটন দূর হোক।

কিন্তু অনেক সময় প্রচুর পরিশ্রম করার পরেও অনেকের অভাব দূর হয় না, কিংবা উপার্জনে কোনো বরকত থাকে না।

ইসলাম আমাদের কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বলেনি, বরং হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করতে নির্দেশ দিয়েছে।

“অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো…”
— সূরা জুমু'আহ (৬২:১০)

পাশাপাশি এমন কিছু আধ্যাত্মিক আমলের কথা বলেছে, যা মানুষের জন্য রিজিকের দরজা খুলে দেয়।

“আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত নয়…”
— সূরা হূদ (১১:৬)

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের রিজিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। তবে কিছু আমলের মাধ্যমে সেই রিজিক ও বরকত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

১. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা

রিজিক কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানুষের গুনাহ। যখন মানুষ আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ কেবল তার গুনাহই মাফ করেন না, বরং দুনিয়াবি নানা নিয়ামত ও রিজিক বাড়িয়ে দেন।

হযরত নূহ (আঃ) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন:
“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন…”
— সূরা নূহ (৭১:১০-১২)

নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করলে আল্লাহ সব সংকট থেকে মুক্তির পথ তৈরি করে দেন।

২. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা

যে ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

“…আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য কোনো না কোনো পথ বের করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে ভাবতেও পারেনি…”
— সূরা আত-ত্বলাক (৬৫:২-৩)

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

পারিবারিক বা আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা রিজিক বৃদ্ধির একটি পরীক্ষিত মাধ্যম। যাঁরা আত্মীয়দের খোঁজখবর রাখেন এবং বিপদে পাশে দাঁড়ান, আল্লাহ তাঁদের আয়ু ও রিজিক বাড়িয়ে দেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:- “যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”
— সহীহ বুখারী: ৫৯৮৬

৪. আল্লাহর ওপর সঠিক তাসাল্লুক বা তাওয়াক্কুল করা

তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:- “তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদের ঠিক সেভাবেই রিজিক দিতেন, যেভাবে পাখিদের দিয়ে থাকেন— যারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় তৃপ্ত হয়ে বাসায় ফেরে।”
— সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪

৫. বেশি বেশি শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করা

আল্লাহ আমাদের যে অবস্থায় রেখেছেন, তার জন্য সবসময় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা উচিত। শুকরিয়া আদায় করলে নিয়ামত আরও বৃদ্ধি পায়, আর অকৃতজ্ঞ হলে নিয়ামত কেড়ে নেওয়া হয়।

“যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেবো; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো আমার শাস্তি বড়ই কঠিন।”
— সূরা ইব্রাহিম (১৪:৭)

৬. নিয়মিত সদকা বা দান করা

অনেকে মনে করেন দান করলে সম্পদ কমে যায়, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ উল্টো। সদকা করলে সম্পদ কমে না, বরং সম্পদে বরকত আসে এবং বিপদ-আপদ দূর হয়।

“আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন…”
— সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭৬)

৭. বিয়ে করা (পবিত্র জীবনের নিয়তে)

দারিদ্র্যের ভয়ে অনেকে বিয়ে করতে বিলম্ব করেন। তবে ইসলাম বলে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে পবিত্র জীবনযাপনের নিয়তে বিয়ে করলে আল্লাহ নিজ দায়িত্বে তাকে স্বাবলম্বী করে দেন।

“তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিয়ে সম্পাদন করো… তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন…”
— সূরা আন-নূর (২৪:৩২)

৮. ইবাদতের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করা

দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর ইবাদতের জন্য বিশেষ সময় বের করা উচিত। এতে অন্তরে এক ধরনের ধনী ভাব বা তৃপ্তি আসে এবং অভাব দূর হয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:- “হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতের জন্য অবসর বের করো, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরিয়ে দেবো এবং তোমার অভাব দূর করে দেবো…”
— সুনানে তিরমিজি: ২৪৬৬

৯. হজ ও ওমরাহ পালন করা

সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য বারবার হজ ও ওমরাহ করা রিজিক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এটি মানুষের গুনাহ এবং দারিদ্র্যকে এমনভাবে দূর করে, যেমন নেহাই লোহার জং দূর করে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:- “তোমরা পর পর হজ ও ওমরাহ আদায় করো। কারণ, এই দুটি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহকে দূর করে দেয়…”
— সুনানে নাসাঈ: ২৬৩১

১০. ব্যবসার ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা

ব্যবসায় সততা, সঠিক ওজন দেওয়া এবং ধোঁকাবাজি না করার মাধ্যমে ব্যবসায় অভাবনীয় বরকত নাজিল হয়। মিথ্যা শপথ বা পণ্যের ত্রুটি লুকিয়ে রাখলে সাময়িক লাভ হলেও শেষ পর্যন্ত বরকত নষ্ট হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:- “সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (আখিরাতে) নবীগণ, সিদ্দিকগণ এবং শহীদগণের সঙ্গী হবেন।”
— সুনানে তিরমিজি: ১২০৯

উপসংহার

রিজিক বাড়ানোর জন্য আমাদের শুধু দুনিয়াবি চেষ্টার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং হালাল উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টার সাথে এই আমলগুলোকে জীবনে ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে বড় রিজিক হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং একটি শান্তিময় জীবন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে উপার্জন করার এবং আমাদের প্রতিটি নিয়ামতে বরকত দান করুন। আমীন।

যদি এই আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তবে শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন।