রহমানের ওলি ও শয়তানের ওলি: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে চেনার উপায় ও আমাদের করণীয়

রহমানের ওলি ও শয়তানের ওলি চেনার উপায় এবং সহীহ নির্দেশনা

ইসলামে ‘ওলি’ বা ‘আউলিয়া’ একটি অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ পরিভাষা। কিন্তু বর্তমান সমাজে অজ্ঞতা ও বাড়াবাড়ির কারণে ওলির আসল রূপ বিকৃত হয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করেন অদ্ভুত বেশভূষা, শরীঅত বর্জন বা ভেলকিবাজি প্রদর্শন করলেই কেউ আল্লাহর ওলি হয়ে যায়। অথচ পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে ওলি মূলত দুই ধরনের—একদল হলেন রহমানের ওলি (আউলিয়াউর রহমান) এবং অন্যদল হলেন শয়তানের ওলি (আউলিয়াউশ শাইতান)। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) তাঁর কালজয়ী কিতাব ‘আল-ফুরকান’ -এ এই সত্য উন্মোচন করে গেছেন। আসুন সহীহ দলিলের আলোকে উভয় দলের স্বরূপ, লক্ষণ এবং তাদের ব্যাপারে আমাদের ইসলামি দায়িত্ব কী তা বিস্তারিত জেনে নিই।

১. ‘ওলি’ শব্দের অর্থ ও কুরআনের মূল বিভাজন

আরবি ‘ওলি’ (ولي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বন্ধু, অভিভাবক, সাহায্যকারী বা অতি নৈকট্যশীল ব্যক্তি। ইসলামি আকীদা অনুযায়ী, বান্দা ও রবের সম্পর্ক এবং আনুগত্যের ভিত্তিতে এই ওলায়াত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় বিভক্ত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা উভয় দলের অভিভাবকত্বের চিত্র অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন:

اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ

“যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক (ওলি); তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর যারা কুফরি করে তাদের অভিভাবক হলো তাগুত (শয়তান); তারা তাদের আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৭

সুতরাং, যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগত হয়ে আলোর পথে চলে, আল্লাহ তার ওলি হন। আর যে ব্যক্তি অবাধ্য ও পথভ্রষ্ট হয়, শয়তান তাকে নিজের সাথী ও ওলি বানিয়ে নেয়।

২. রহমানের ওলি (আউলিয়াউর রহমান)-এর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

পবিত্র কুরআন কোনো দর্শন বা কল্পকাহিনীর ওপর ওলির সংজ্ঞা ছেড়ে দেয়নি, বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ওলির একমাত্র মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছেন:

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ۝ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ

“জেনে রেখো! নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের (আউলিয়াদের) কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না—যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা ইউনূস, আয়াত: ৬২-৬৩

ব্যাখ্যা: এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তাআলা প্রকৃত ওলির পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আল্লাহর ওলি হওয়া কোনো বিশেষ পোশাক, বংশ, উপাধি, অলৌকিক ক্ষমতা বা মানুষের দেওয়া মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এর ভিত্তি হলো ঈমান ও তাকওয়া। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সঠিক ঈমান রাখে, তাঁর তাওহীদ মেনে চলে এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বন করে, সে আল্লাহর ওলিদের অন্তর্ভুক্ত। মুফাসসিরগণও এই আয়াতের আলোকে উল্লেখ করেছেন যে, ঈমান ও তাকওয়াই আল্লাহর ওলির মূল বৈশিষ্ট্য।

আল্লাহ তাআলা প্রথমে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” এর অর্থ হলো—আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য আখিরাতে ভয় ও দুঃখের পরিণতি থাকবে না। তারা দুনিয়াতেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে এবং আখিরাতের ব্যাপারে আল্লাহর রহমত ও প্রতিশ্রুতির ওপর আশাবাদী থাকে। এরপর আল্লাহ নিজেই তাঁদের পরিচয় দিয়েছেন: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।” তাই প্রকৃত ওলির পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিশুদ্ধ ঈমান এবং তাকওয়া।

এই আয়াত থেকে আরও বোঝা যায় যে, আল্লাহর ওলির মর্যাদা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বংশ বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাধারণ মুমিনও যদি বিশুদ্ধ ঈমানের সঙ্গে তাকওয়ার জীবনযাপন করেন, তবে তিনি আল্লাহর ওলিদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। একইভাবে কেউ নিজেকে ওলি দাবি করলেই তিনি আল্লাহর ওলি হয়ে যান না; বরং তাঁর ঈমান ও আমল কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই বিবেচ্য।

সুতরাং এই আয়াতদ্বয়ের মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ হলো ঈমান ও তাকওয়া। কোনো কারামাত, অস্বাভাবিক ঘটনা, বিশেষ পোশাক, বংশপরিচয় কিংবা মানুষের দেওয়া উপাধি আল্লাহর ওলির প্রকৃত মাপকাঠি নয়। একজন মুসলিমের উচিত অলৌকিক দাবি বা ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে মানুষের ঈমান ও আমলকে মূল্যায়ন করা এবং নিজেও ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা।

৩. আল্লাহর ওলি হওয়ার পথ: প্রথমে ফরজ, তারপর নফল

আল্লাহর ওলিদের পরিচয় ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো হাদিসে কুদসি। এতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর নৈকট্য অর্জনের সঠিক পথ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ، يَكْرَهُ الْمَوْتَ، وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ.

অর্থ: আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো সেই কাজগুলো যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার সেই শ্রবণেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শোনে; তার সেই দৃষ্টিশক্তি হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে দেখে; তার সেই হাত হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে ধরে; এবং তার সেই পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই। আর আমি এমন কোনো কাজ করতে যতটা ইতস্তত করি, যা আমি করব, তার চেয়ে বেশি ইতস্তত করি মুমিনের প্রাণ গ্রহণের ব্যাপারে; সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং আমি তার কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি।”
সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৫০২

ব্যাখ্যা: এই হাদিসে আল্লাহর ওলির মর্যাদা এবং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের একটি সুস্পষ্ট পথ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।” এর মাধ্যমে আল্লাহর নেককার ও প্রিয় বান্দাদের মর্যাদা বোঝানো হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো ব্যক্তিকে নিজের মনগড়া ধারণায় “ওলি” ঘোষণা করে তার প্রত্যেক কাজকে সমর্থন করতে হবে। কুরআন যেমন বলেছে, আল্লাহর ওলির মূল পরিচয় হলো ঈমান ও তাকওয়া

এরপর হাদিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছে: “আমার বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।” অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরজগুলো যথাযথভাবে পালন করা। এরপর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য আরও বৃদ্ধি করতে থাকে। সুতরাং কেউ যদি ফরজ আমলকে অবহেলা করে অথচ শুধু নফল, জিকির, বিশেষ আমল বা আধ্যাত্মিকতার দাবি করে, তাহলে সে এই হাদিসের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করছে না।

তাই আল্লাহর ওলি হওয়ার পথ হলো ফরজ → তাকওয়া → নফল → আল্লাহর ভালোবাসা। নফল আমল ফরজের বিকল্প নয়; বরং ফরজ আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত অতিরিক্ত নৈকট্যের মাধ্যম। একজন বান্দা প্রথমে আল্লাহর ফরজ বিধানগুলো পালন করবে, হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে এবং এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর আরও নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করবে।

ফরজ আমলের মধ্যে কী কী রয়েছে?

আল্লাহর ওলির পথে চলতে হলে একজন মুসলিমের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যে ফরজ দায়িত্বগুলো অর্পণ করেছেন, সেগুলো যথাসম্ভব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • তাওহীদ ও ঈমান: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, শিরক থেকে বেঁচে থাকা এবং ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো বিশ্বাস করা।
  • সালাত: পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।
  • সিয়াম: রমজান মাসের ফরজ রোজা পালন করা, যদি শরয়ি কোনো ওজর না থাকে।
  • যাকাত: যার ওপর শরিয়ত অনুযায়ী যাকাত ফরজ হয়েছে, তার যথাযথভাবে যাকাত আদায় করা।
  • হজ: সামর্থ্য ও অন্যান্য শরয়ি শর্ত পূরণ হলে জীবনে অন্তত একবার ফরজ হজ আদায় করা।
  • হারাম থেকে বেঁচে থাকা: আল্লাহ যেসব বিষয় হারাম করেছেন সেগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখাও তাকওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  • পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার: আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো নির্দেশ না থাকলে পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা, তাদের সম্মান করা এবং তাদের অধিকার আদায় করা।
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা: আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অন্যায়ভাবে সম্পর্ক ছিন্ন না করা।
  • স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের অধিকার আদায়: পরিবারের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করা, তাদের ভরণপোষণ করা এবং তাদের সঙ্গে ন্যায় ও সদাচরণ করা।
  • মানুষের হক আদায়: কারও সম্পদ, সম্মান বা অধিকার অন্যায়ভাবে নষ্ট না করা এবং আমানত যথাযথভাবে আদায় করা।
  • অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকা: মানুষের ওপর জুলুম না করা এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বে ন্যায়পরায়ণ থাকা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ফরজ শুধু নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের ওপর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ফরজ ও অধিকার বর্তায়। যেমন পিতা-মাতার অধিকার, স্ত্রী-সন্তানের অধিকার, আত্মীয়তার অধিকার, আমানত রক্ষা এবং মানুষের অধিকার আদায় করা। একইভাবে হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকাও আল্লাহর আনুগত্যের অপরিহার্য অংশ।

ফরজের সাথে মানুষের হক আদায়ের গুরুত্ব

এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হলো, সে প্রচুর নামাজ, রোজা ও দান-সদকা করে; কিন্তু প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "সে জাহান্নামী।" আরেক নারী সম্পর্কে বলা হলো, সে শুধু ফরজ আমল করে কিন্তু প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "সে জান্নাতী।" — মুসনাদ আহমাদ, আদাবুল মুফরাদ; সহীহ

মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ৯৬৭৫; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদিস: ৫৭৬৪। হাদিসটি আলবানী (রহ.)-ও সহীহ বলেছেন।

অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি রাত জেগে অনেক নফল নামাজ পড়ে, দীর্ঘ সময় জিকির করে বা নিজেকে বড় কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে ফরজ নামাজ পরিত্যাগ করে, ফরজ যাকাত আদায় করে না যখন তার ওপর তা ফরজ, অথবা মানুষের ফরজ অধিকার নষ্ট করে—তাহলে তার এই নফল আমলগুলো তাকে ফরজের বিকল্প বানিয়ে দিতে পারে না। আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার পথ হলো প্রথমে তাঁর ফরজ বিধানগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, তারপর নফল আমলের মাধ্যমে নৈকট্য বৃদ্ধি করা।

এরপর হাদিসে বলা হয়েছে, বান্দা যখন নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর আল্লাহ যখন তাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত ও পাকে হেফাজত করেন। “আমি তার শ্রবণ হয়ে যাই” কথাটির অর্থ এই নয় যে আল্লাহ বান্দার শরীরের কোনো অঙ্গে পরিণত হন—আল্লাহ এ ধরনের ধারণা থেকে পবিত্র। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে এমনভাবে হেফাজত ও পরিচালনা করেন যে সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে তার কান, চোখ, হাত ও পা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকে এবং এগুলোকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যবহার করে।

হাদিসের শেষাংশে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনার ব্যাপারে বিশেষ অনুগ্রহের কথা বলেছেন। সে আল্লাহর কাছে চাইলে আল্লাহ তাকে দান করেন এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাইলে তিনি তাকে আশ্রয় দেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকৃত ওলি মানুষের সামনে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি নন; বরং তিনি এমন একজন বান্দা, যিনি আল্লাহর আনুগত্য, তাকওয়া এবং ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করেন।

সুতরাং এই হাদিস আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: আল্লাহর ওলি হওয়ার পথ কোনো গোপন আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বা বিশেষ বংশের মাধ্যমে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, ফরজ আমল পালন, হারাম বর্জন এবং এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মধ্য দিয়ে।

  • বিশুদ্ধ ঈমান ও সুন্নাহর অনুসরণ: তাওহীদ ও বিশুদ্ধ ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করেন।
  • তাকওয়া ও ফরজ আমল: আল্লাহর ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করেন এবং হারাম ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন।
  • নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য: ফরজ আমলের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর আরও নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করেন।
  • বিনয় ও আল্লাহভীতি: নিজেদের মর্যাদা জাহির না করে বিনয়ী থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর ভয় ও তাঁর রহমতের আশার মধ্যে জীবনযাপন করেন।

৪. শয়তানের ওলি (আউলিয়াউশ শাইতান)-এর স্বরূপ ও লক্ষণ

শয়তানের ওলি হলো সেই সমস্ত লোক, যাদের শয়তান ধোঁকা দিয়ে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করেছে এবং তারা নিজেদের আত্মপূজা বা ভণ্ডামির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। পবিত্র কুরআনে এদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ

“নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের অভিভাবক (ওলি) করেছি, যারা ঈমান আনে না।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২৭

وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا

"যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, সে স্পষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।"
— সূরা আন-নিসা: ১১৯

বর্তমান সমাজে শয়তানের ওলিদের চেনার প্রধান কিছু লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:

  • শরীঅতের বিধান লঙ্ঘন:
    এরা দাবি করে যে তারা আধ্যাত্মিকতার এমন স্তরে পৌঁছে গেছে যেখানে নামাজ, রোজা বা হালাল-হারামের নিয়ম আর প্রযোজ্য নয়। অথচ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবীগণ জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সালাত আদায় করে গেছেন।
  • শিরক ও কবরপূজার প্রসার:
    এরা মানুষকে আল্লাহর বদলে মৃত ব্যক্তি বা নিজেদের সাজানো দরগাহে সেজদা ও মানত করতে উৎসাহিত করে, যা প্রকাশ্য শিরক।
  • ভেলকিবাজি ও শয়তানি কৌশল প্রদর্শন:
    জিন-ভূত বশ করে, জাদু কিংবা হাতসাফাই দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানায়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন: “যদি কোনো ব্যক্তিকে বাতাসে উড়তে কিংবা পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে দেখো, তবুও তাকে ওলি মনে কোরো না—যতক্ষণ না তার কাজকে কুরআন ও সুন্নাহর দাঁড়িপাল্লায় পরীক্ষা করবে।”
  • অশ্লীলতা ও গাঁজা-নেশায় লিপ্ত থাকা:
    অনেক ভণ্ড পাগল বা মাজজুবের ভান ধরে নোংরামি ও মাদকে ডুবে থাকে, অথচ ইসলাম পবিত্রতা ও সুস্থ বিবেকের ধর্ম।

৫. উভয় দলের ক্ষেত্রে মুসলিমদের করণীয়

এই দুই শ্রেণির ব্যক্তির মুখোমুখি হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত সীমারেখার মধ্যে রাখা জরুরি:

  • রহমানের ওলিদের ক্ষেত্রে করণীয়:
    • ভালোবাসা ও সম্মান: আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তরে ভালোবাসা রাখা ঈমানের অংশ। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ বলেন: “যে ব্যক্তি আমার ওলির সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিই।” (সহীহ বুখারী: ৬৫০২)।
    • সুন্নাহর অনুসরণ: তাঁদের জীবনের তাকওয়া, সততা ও আমল নিজের জীবনে ধারণ করা।
    • বাড়াবাড়ি বা সীমা লঙ্ঘন বর্জন: তাঁদের অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে সেজদা করা, তাঁদের কাছে দোয়ার চেয়ে সরাসরি সন্তান বা রিজিক চাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাঁরা মানুষ, রব নন।
  • শয়তানের ওলিদের ক্ষেত্রে করণীয়:
    • সতর্কতা ও বর্জন: এদের ভেলকিবাজি ও আধ্যাত্মিকতার দাবি দেখে প্রতারিত না হওয়া এবং এদের আস্তানা ও মাজারে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
    • প্রতিহত ও সংশোধন: দ্বীনের সঠিক জ্ঞান প্রচার করে পরিবার ও সাধারণ মানুষকে এই সমস্ত ভণ্ডদের ধোঁকা থেকে হেফাজত করা।
    • সুন্নাহর মানদণ্ডে বিচার: যেকোনো বক্তা বা পীরকে দেখার সময় তার চমৎকার কথার চেয়ে তার বাস্তব জীবনে কুরআন ও সুন্নাহর আমল কতটুকু আছে, তা যাচাই করা।

উপসংহার: আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ

আল্লাহর ওলি হওয়া কোনো বংশগত পদবী বা বিশেষ কোনো পোশাকের বিষয় নয়; বরং প্রতিটি মুমিন পুরুষ ও নারী যদি খাঁটি ঈমানদার হয়ে তাকওয়ার জীবন গ্রহণ করে, তবে সে-ই আল্লাহর ওলি বা নৈকট্যশীল বান্দায় পরিণত হতে পারে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে শয়তান ও তার দোসরদের বিভ্রান্তিকর ফাঁদ থেকে হেফাজত করুন, সহীহ বুঝ দান করুন এবং তাঁর প্রিয় ও অনুগত বান্দা—রহমানের প্রকৃত ওলিদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: কুরআন অনুযায়ী আল্লাহর প্রকৃত ওলি কারা?

উত্তর: পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনূসের ৬২ ও ৬৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, প্রকৃত আল্লাহর ওলি হলেন তারা—যারা বিশুদ্ধ ঈমান এনেছেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর তাকওয়া (পরহেজগারি) অবলম্বন করেন।

প্রশ্ন ২: শরীঅত না মেনে কি কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারে?

উত্তর: না, কখনোই নয়। শরীঅতের হুকুম (যেমন: সালাত, সাওম, পর্দা, হালাল-হারাম) ত্যাগ করে কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারে না। বরং শরীঅত অমান্যকারী ব্যক্তি শয়তানের ধোঁকা ও ফাঁদে নিমজ্জিত।

প্রশ্ন ৩: ভেলকিবাজি বা অলৌকিক কিছু দেখালেই কি কাউকে ওলি বলা যাবে?

উত্তর: না। অলৌকিক ঘটনা (ইস্তিদরাজ) শয়তান ও জাদুকরদের মাধ্যমেও ঘটতে পারে। কোনো ব্যক্তির মূল্যায়ন তার অলৌকিক ক্ষমতার ভিত্তিতে নয়, বরং তার আকীদা ও আমল কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী কি না—তার ভিত্তিতে হবে।

প্রশ্ন ৪: কারামাত দেখালেই কি কেউ আল্লাহর ওলি হয়ে যায়?

উত্তর: না। কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারে, আবার ইস্তিদরাজ বা শয়তানি ধোঁকাও হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি হলো তার ঈমান, আকীদা ও কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ।

দ্বীনের সঠিক আকিদা প্রচার ও সমাজের কুসংস্কার দূর করতে এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি আপনার পরিবার ও পরিচিতদের মাঝে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।