ইসলামিক হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম। আর এই মহররম মাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দিনটি হলো "১০ই মহররম" বা পবিত্র আশুরা। মুসলিম বিশ্বে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, আশুরার দিনটি কেবলই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.)-এর কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণের দিন এবং এটি কেবলই একটি শোকের দিন। কিন্তু ইসলামিক ইতিহাসের পাতা ও সহীহ হাদিস ঘাটলে দেখা যায়, কারবালার এই হৃদয়বিদারক ঘটনার বহু আগে থেকেই, এমনকি ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই আশুরার দিনটি অত্যন্ত বরকতময় এবং বিজয়ের এক অনন্য প্রতীক। আসুন আজ জেনে নিই পবিত্র আশুরার মূল ইতিহাস, এর ফজিলত এবং এই দিনটিকে ঘিরে একজন মুমিনের সঠিক করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ।
ঐতিহাসিকভাবে আশুরার দিনটি কেবল একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; বরং এটি জালিমের বিরুদ্ধে হকের বিজয়, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাঁর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ইসলামের ইতিহাসে আশুরার তাৎপর্য বহু প্রাচীন। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার অনেক আগে থেকেই এই দিনটি নবী-রাসুলদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল।
কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে, মিসরের শাসক ফেরাউন নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করত এবং বনী ইসরাইলের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাত। সে তাদের পুরুষ সন্তানদের হত্যা করত এবং নারীদের জীবিত রাখত। এই জুলুম ও অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী হযরত মুসা (আ.)-কে প্রেরণ করেন।
দীর্ঘ সংগ্রাম ও আল্লাহর পক্ষ থেকে একের পর এক নিদর্শন প্রদর্শনের পরও ফেরাউন অহংকার ও অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসেনি। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) বনী ইসরাইলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। ফেরাউন বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে। যখন মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছান এবং সামনে উত্তাল সাগর ও পেছনে ফেরাউনের বাহিনী দেখতে পান, তখন তারা ভীত হয়ে পড়েন। কিন্তু মুসা (আ.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন:
“কখনো নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।”
অতঃপর মহান আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে তাঁর লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর অসীম কুদরতে সাগর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এবং সেখানে শুকনো পথ তৈরি হয়। মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইল নিরাপদে সাগর পার হয়ে যান। অন্যদিকে ফেরাউন ও তার বাহিনী একই পথে প্রবেশ করলে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সাগরের পানি ফিরিয়ে দেন এবং তারা সবাই ডুবে যায়। এভাবেই আশুরার দিনটি জুলুমের পরাজয় এবং সত্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মদীনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ লক্ষ্য করলেন যে, সেখানকার ইহুদিরা ১০ মহররমে রোজা রাখছে। তিনি তাদের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, “এটি একটি মহান দিন। এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন। তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) এই দিনে রোজা রাখতেন, আমরাও রাখি।”
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন:
“তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)-এর অধিক হকদার ও নিকটবর্তী।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২০০৪
এরপর থেকে নবীজী ﷺ নিজে আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হিজরি ৬১ সনে এই একই দিনে কারবালার প্রান্তরে হযরত হোসাইন (রা.) সপরিবারে শাহাদাত বরণ করায় এই দিনটিতে উম্মাহর জন্য এক নতুন আবেগ ও শোকের অধ্যায় যুক্ত হয়।
রমজানের ফরজ রোজার পর আল্লাহর কাছে মহররম মাসের নফল রোজা সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আর মহররমের রোজার মধ্যে আশুরার রোজার ফজিলত অনন্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
রোজা রাখার সুন্নাহ নিয়ম: আশুরার রোজা পালনের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে ইহুদিদের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহার করার শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণে তিনি শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখার পরিবর্তে এর সঙ্গে আরও একটি রোজা মিলিয়ে রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
“আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪
এই হাদিসের আলোকে আলেমগণ বলেন, আশুরার রোজা পালনের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো ৯ ও ১০ মহররম—এই দুই দিন রোজা রাখা। আর যদি কোনো কারণে ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা উত্তম। তবে কেউ যদি শুধু ১০ মহররমেই রোজা রাখেন, তাহলেও ইনশাআল্লাহ আশুরার রোজার ফজিলত লাভ করবেন।
অনেক আলেম ৯, ১০ ও ১১ মহররম—এই তিন দিন রোজা রাখাকেও উত্তম মনে করেন। এর মাধ্যমে আশুরার রোজার প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদর্শনের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানো সহজ হয়।
হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররমে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এই দিনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য এবং অল্পসংখ্যক সঙ্গী সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থেকে শাহাদাত বরণ করেন।
কারবালার ঘটনা আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের জীবনে সত্য, ন্যায় এবং আদর্শের মূল্য পার্থিব স্বার্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও অনেক বেশি। হযরত হোসাইন (রা.) ক্ষমতা বা নেতৃত্বের লোভে নয়; বরং অন্যায়, জুলুম এবং দ্বীনের মৌলিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি আমাদের জন্য এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যা যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে সত্যের পথে অটল থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখি যে, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, একজন প্রকৃত মুমিন কখনো অন্যায়, মিথ্যা ও জুলুমের সঙ্গে আপস করতে পারে না।
কারবালার ঘটনা কেবল একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি নয়; এটি আত্মত্যাগ, ধৈর্য, আত্মমর্যাদা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই আশুরার দিন এলে আমাদের উচিত কেবল আবেগে আপ্লুত না হয়ে হযরত হোসাইন (রা.)-এর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া—অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া।
আমরা যখন আশুরার শিক্ষা স্মরণ করব, তখন কেবল বাহ্যিক শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের জীবনে সেই ‘হোসাইনী চেতনা’ ধারণ করার চেষ্টা করব—যে চেতনা মানুষকে হকের পথে দৃঢ় রাখে, জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখায় এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
কারবালার ময়দানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সালাতের প্রতি অবিচল থাকা। ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতি ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও হযরত হোসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীরা সালাতের গুরুত্বকে অবহেলা করেননি। এ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একজন মুমিনের জীবনে সালাতের গুরুত্ব এতটাই অপরিসীম যে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা প্রয়োজন।
দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে শরিয়ত বিরোধী অনেক বেদাত ও কুসংস্কারের প্রচলন ঘটেছে। অনেকে এই দিনে বুক চাপড়ে 'হায় হোসেন' বলে মাতম করেন, শরীরকে রক্তাক্ত করেন এবং তাজিয়া মিছিল বের করেন। ইসলামে এই ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (বিপদে পড়ে) নিজের গালে চড় মারে, জামার বক্ষ বিদীর্ণ করে এবং জাহেলী যুগের মতো চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি বা মাতম করে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২৯৪
এছাড়া আশুরার দিনে খিচুড়ি রান্না করাকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করা, নতুন কাপড়ে শোক প্রকাশ করা কিংবা এই দিনে বিয়ে-শাদি করাকে অমঙ্গলজনক মনে করার মতো যেসব কুসংস্কার রয়েছে, সেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।
প্রশ্ন: যদি কেউ ৯ মহররমের রোজা রাখতে না পারে, তবে কি শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, কোনো কারণে ৯ মহররমের রোজা রাখা সম্ভব না হলে শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখলেও ইনশাআল্লাহ আশুরার রোজার ফজিলত লাভ করা যাবে। তবে সুন্নাহ অনুযায়ী উত্তম হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম—এই দুই দিন রোজা রাখা, যাতে ইহুদিদের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্য না থাকে। তাই ৯ তারিখের রোজা মিস হয়ে গেলে ১০ তারিখের সঙ্গে ১১ তারিখে আরও একটি রোজা মিলিয়ে নেওয়া উত্তম।
প্রশ্ন: আশুরার দিনে কি শুধু কারবালার ঘটনাই ঘটেছিল, নাকি পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসও এর সাথে জড়িত?
উত্তর: আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে আশুরার দিনেই কিয়ামত হবে, আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল বা আরশ-কুরসি সৃষ্টি হয়েছিল। ইসলামিক স্কলারদের মতে, মুসা (আ.)-এর মুক্তি এবং কারবালার ঘটনা ছাড়া বাকি অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনা দুর্বল বা ভিত্তিহীন। তাই সহীহ দলিল রয়েছে এমন ইতিহাসকেই বিশ্বাস করা উচিত।
পবিত্র আশুরা আমাদের একদিকে যেমন আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রাখার শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগায়। আসুন, এই দিনে আমরা সব ধরণের কুসংস্কার ও শরিয়ত বিরোধী কাজ পরিহার করি। নবীজী ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রেখে এবং কারবালার বীরদের আদর্শ বুকে ধারণ করে নিজেদের একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলি।
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, আশুরার সঠিক ইতিহাস ও এর ভেতরের সুন্নাহ আমলগুলো সম্পর্কে সমাজের সাধারণ মানুষদের সচেতন করা আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করতে এবং হকের বাণী ছড়িয়ে দিতে আর্টিকেলটি এখনই আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে অবশ্যই শেয়ার করুন।