সুস্থতা মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া অন্যতম সেরা নেয়ামত। সুস্থ না থাকলে কোনো কাজে যেমন মনোযোগ দেওয়া যায় না, তেমনি ঠিকমতো আল্লাহর ইবাদতও করা যায় না। বর্তমান যুগে জিম, ক্র্যাশ ডায়েট, কিংবা নানা রকমের আধুনিক থেরাপি করেও মানুষ রোগবালাই থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। অথচ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা বা লাইফস্টাইল শিখিয়ে গেছেন, যা অনুসরণ করলে মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ ও ফিট থাকতে পারে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় সুস্থ জীবনযাপনের জন্য যেসব উপকারী অভ্যাসের কথা উঠে আসে, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নতি জীবনধারার উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ্য করা যায়। আসুন আজ জেনে নিই সুস্থ ও নিরোগ শরীর গঠনে প্রিয় নবী ﷺ-এর খাবার অভ্যাস ও জীবনযাপনের চমৎকার কিছু সুন্নতি গাইডলাইন।
ইসলাম শুধু পরকালের মুক্তির কথাই বলে না, বরং ইহকালে একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবন কাটানোর ওপরও সমান তাগিদ দেয়। একজন দুর্বল ও রুগ্ন মুমিনের চেয়ে একজন শক্তিশালী ও সুস্থ মুমিন আল্লাহর কাছে অনেক বেশি প্রিয়। শরীর অলস ও অসুস্থ থাকলে ইবাদতে অলসতা চলে আসে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ পাঁচটি মূল্যবান নেয়ামত চলে যাওয়ার আগে সেগুলোকে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যার অন্যতম একটি হলো—'অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে কাজে লাগানো'। তাই নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া এবং একে রোগমুক্ত রাখা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একটি দায়িত্ব ও আমল।
"শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যে বিষয় তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। যদি কোনো বিপদ আসে, তবে বলো না—‘যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো।’ বরং বলো, ‘এটি আল্লাহর ফয়সালা; তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন।’ কারণ ‘যদি’ কথাটি শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪
এই হাদিস থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, একজন মুমিনের উচিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা, উপকারী কাজের প্রতি আগ্রহী হওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং অলসতা ও হতাশা থেকে দূরে থাকা। কারণ সুস্থ, কর্মঠ ও দৃঢ়চেতা মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
আমাদের অধিকাংশ রোগ শুরু হয় পেট বা হজমপ্রক্রিয়ার সমস্যা থেকে। রাসুলুল্লাহ ﷺ অতিরিক্ত ভোজন বা পেট পুরে খাওয়াকে একদমই পছন্দ করতেন না। সুস্থ থাকার জন্য তিনি খাবারের ক্ষেত্রে চমৎকার এক অনুপাত শিখিয়েছেন:
“কোনো মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি। আদম সন্তানের জন্য তার মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমাই যথেষ্ট। যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তবে তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৪৯
আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, পরিমিত আহার ও অতিভোজন থেকে বিরত থাকা ওজন নিয়ন্ত্রণ, হজমপ্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
খাবারের অভ্যাসের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দৈনিক জীবনযাপনের পদ্ধতিও ছিল চমৎকার ও বিজ্ঞানসম্মত। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতি অভ্যাস তুলে ধরা হলো:
ক. রাতে দ্রুত ঘুমানো ও ভোরে জাগা: রাসুলুল্লাহ ﷺ এশার সালাতের পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও আড্ডা অপছন্দ করতেন এবং দ্রুত ঘুমাতে যেতেন। এরপর শেষ রাতে বা ফজরের আগে জেগে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতেন। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত রাতের ঘুম শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার (Recovery), হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইভাবে ভোরে জেগে দিন শুরু করলে কর্মক্ষমতা, মনোযোগ এবং দৈনন্দিন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
খ. কাইলুলা বা দুপুরের সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম: দুপুরে খাওয়ার পর বা যোহরের আগে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত, একে 'কাইলুলা' বলা হয়। বর্তমানে করপোরেট বিশ্বে একে 'পাওয়ার ন্যাপ' (Power Nap) বলা হচ্ছে, যা দুপুরের পর ক্লান্তি দূর করে ব্রেনকে পুনরায় চাঙ্গা করতে দুর্দান্ত কাজ করে।
গ. নিয়মিত রোজা রাখা: রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং প্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে (আইয়ামে বীজ) নফল রোজা রাখতেন। আধুনিক গবেষণায়ও নির্দিষ্ট সময় উপবাস (Intermittent Fasting) নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। জাপানি গবেষক Yoshinori Ohsumi কোষের Autophagy (অটোফেজি) প্রক্রিয়ার কার্যপ্রণালী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য ২০১৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের সময় শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে, যা কোষের ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান পুনর্ব্যবহার ও অপসারণে সহায়তা করে। এ বিষয়ে গবেষণা এখনও চলমান, তবে এটি কোষের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ সবসময় হালাল ও পবিত্র খাবার খেতেন। তবে কিছু প্রাকৃতিক খাবার তিনি বিশেষভাবে পছন্দ করতেন, যেগুলোর পুষ্টিগুণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজ সর্বজনস্বীকৃত:
রাসুলুল্লাহ ﷺ কালোজিরা সম্পর্কে বলেছেন, "এই কালোজিরায় মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক রোগের জন্য শিফা রয়েছে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫৬৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২১৫)। অন্যদিকে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মধু সম্পর্কে বলেছেন, "এতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য।" (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬৯)। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, মধু ও কালোজিরায় বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী উপাদান রয়েছে, যা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
খেজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় খাদ্যগুলোর একটি ছিল। এটি প্রাকৃতিক শর্করা, আঁশ, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের একটি ভালো উৎস, যা দ্রুত শক্তি জোগাতে সহায়তা করে। দুধ একটি পুষ্টিকর খাবার, যাতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। এছাড়া রাসুলুল্লাহ ﷺ অলিভ অয়েল (জয়তুনের তেল) খেতে এবং তা ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, পরিমিত পরিমাণে অলিভ অয়েল স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে হৃদ্স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
"তোমরা জয়তুনের তেল (অলিভ অয়েল) খাও এবং তা দিয়ে শরীরে মালিশ করো। কেননা এটি একটি বরকতময় গাছ থেকে আসে।"
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৫১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩১৯
উত্তর: রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেতে হলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত। এটি পরিমিত আহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
উত্তর: না। রাসুলুল্লাহ ﷺ গরম খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। স্বাস্থ্যবিধির দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি উপকারী, কারণ এতে মুখের লালা বা শ্বাসের মাধ্যমে জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে।
উত্তর: হ্যাঁ। মধু, কালোজিরা, খেজুর এবং জয়তুনের তেল (অলিভ অয়েল)-এর মতো সুন্নতি খাবারগুলোতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। পরিমিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এগুলো শরীরের স্বাভাবিক সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
সুস্থ ও ফিট থাকার জন্য আমাদের নতুন কোনো কৃত্রিম ডায়েট চার্ট বা ক্ষতিকারক পদ্ধতির পেছনে দৌড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রিয় নবী ﷺ যে জীবনপদ্ধতি দেখিয়ে গেছেন, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক প্রশান্তি। আমরা যদি নিয়ত করি যে, সুস্থ থেকে আল্লাহর ইবাদত করার উদ্দেশ্যে আমরা এই সুন্নাহগুলো মেনে চলব, তবে আমাদের প্রতিটি সুন্নতি অভ্যাস ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং আমরা সওয়াব পাব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী ﷺ এর সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার এবং সুস্থ ও ফিট থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।
স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুন্নাহর এই বার্তাটি সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আর্টিকেলটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করতে ভুলবেন না। জাজাকাল্লাহু খাইরান।