মহররম মাসে প্রচলিত মারাত্মক সব কুসংস্কার ও বেদাআত: যা থেকে আমাদের বাঁচা জরুরি

মহররম মাসের কুসংস্কার ও বেদাআত

মহররম মাস হিজরি সনের প্রথম মাস এবং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের সমাজে মহররম মাস শুরু হতে না হতেই ধর্ম পালনের নামে এমন কিছু প্রথা, উৎসব এবং কুসংস্কারের জোয়ার ভেসে আসে, যার সাথে পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকেই না জেনে, আবার কেউ কেউ বংশপরম্পরায় অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে এই মারাত্মক বেদাতগুলোতে লিপ্ত হচ্ছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট সতর্কবাণী দিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর পথনির্দেশ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন। প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৭

আসুন আজ জেনে নিই মহররম মাস এবং ১০ই আশুরাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে প্রচলিত সমস্ত মারাত্মক কুসংস্কার, ভুল ধারণা ও বেদাআতগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা—যাতে আমরা নিজেরা এগুলো থেকে বাঁচতে পারি এবং অপর ভাইকেও সতর্ক করতে পারি।

১. তাজিয়া মিছিল এবং কারবালার নকল কবর তৈরি করা

মহররমের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান বেদাত হলো তাজিয়া মিছিল। এই দিনে কাগজের বা কাঠের তৈরি কৃত্রিম কারবালার ময়দান, হযরত হোসাইন (রা.)-এর নকল কবর (তাজিয়া) এবং দুলদুল ঘোড়া বানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো মৃত ব্যক্তির কবর বা মাজারের সাদৃশ্য তৈরি করে রাস্তায় মিছিল করা এবং সেগুলোর সামনে মানত করা বা সম্মান প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ হারাম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা শিরকের পর্যায়ে চলে যায়।

২. হায় হোসাইন বলে মাতম করা ও নিজের শরীর রক্তাক্ত করা

আশুরার দিন শিয়াদের অনুকরণে অনেক সাধারণ মুসলিমও বুক চাপড়ে, জঞ্জির বা তরবারি দিয়ে নিজের পিঠ কেটে শরীর রক্তাক্ত করে মাতম করে। ইসলামে যেকোনো বিপদে বা কারো মৃত্যুতে এভাবে উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটি ও মাতম করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (বিপদে পড়ে) নিজের গালে চড় মারে, জামার বক্ষ বিদীর্ণ করে এবং জাহেলী যুগের মতো চিৎকার বা মাতম করে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২৯৪

৩. মহররম মাসকে "শোকের মাস" মনে করে কালো পোশাক পরা

অনেকে মহররমের প্রথম দশ দিন বা পুরো মাস জুড়ে কালো বা নীল রঙের কাপড় পরিধান করে শোক প্রকাশ করেন। মনে রাখা দরকার, ইসলামে কারো ইন্তেকালের পর সর্বোচ্চ ৩ দিন শোক পালনের অনুমতি আছে (শুধুমাত্র স্ত্রী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর ৪ মাস ১০ দিন শোক পালন করবেন)। হযরত হোসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেছেন আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে, তাঁর জন্য প্রতি বছর নিয়ম করে পোশাকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয়ভাবে শোক পালন করা স্পষ্ট সুন্নাহ বিরোধী কাজ।

৪. এই মাসে বিয়ে-শাদি, নতুন ঘর বা ব্যবসা অমঙ্গলজনক মনে করা

আমাদের সমাজে একটি বড় কুসংস্কার হলো, মহররম মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি হয়, কিংবা এই মাসে নতুন ঘর তৈরি বা ব্যবসা শুরু করলে বরকত পাওয়া যায় না। এটিকে একটি "অশুভ মাস" বা "অপয়া মাস" মনে করা হয়। ইসলামে কোনো দিন, মাস বা ক্ষণকে অপয়া বা অমঙ্গলজনক মনে করা এক ধরণের জাহেলী বিশ্বাস। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "ইসলামে কোনো ছোঁয়াচে রোগ বা অশুভ লক্ষণ বলতে কিছু নেই।" (সহীহ বুখারী)। সুতরাং, অন্য যেকোনো মাসের মতোই এই মাসেও বিয়ে বা শুভ কাজ করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

৫. আশুরার দিনে খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করাকে সওয়াব মনে করা

অনেকে মনে করেন আশুরার দিনে বাড়িতে ভালো মন্দ রান্না করা, বিশেষ করে খিচুড়ি বা হালুয়া-রুটি তৈরি করে প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করলে বিশেষ সওয়াব হয়। এই ধারণার সপক্ষে যে হাদিসগুলো সমাজে প্রচলিত আছে (যেমন: যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারকে ভালো খাওয়াবে, আল্লাহ সারা বছর তার রিজিকে বরকত দেবেন) সেগুলো মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত মতে অত্যন্ত দুর্বল অথবা বানোয়াট (মওজু)। আশুরার একমাত্র প্রমাণিত আমল হলো রোজা রাখা, কোনো বিশেষ ভোজের আয়োজন করা নয়।

৬. ইতিহাস নিয়ে মনগড়া ও কাল্পনিক কেচ্ছা-কাহিনী ছড়ানো

মহররমের দিনগুলোতে অনেক বক্তা বা মানুষ এমন কিছু কাল্পনিক কাহিনী বর্ণনা করেন যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। যেমন:

  • এই দিনে আরশ-কুরসি, আসমান-জমিন এবং লওহ-কলম সৃষ্টি করা হয়েছে।
  • এই দিনে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
  • হযরত হোসাইন (রা.)-এর কাটা মাথা নাকি ইয়াজিদের দরবারে গিয়ে কথা বলেছিল।

সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ইতিহাস হলো—এই দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং হিজরি ৬১ সনে এই দিনে হযরত হোসাইন (রা.) শহীদ হন। এর বাইরে বাকি সব মুখরোচক গল্প সম্পূর্ণ বানোয়াট।

৭. গাছে বা ঘরের দরজায় লোহা, সুতো বা তাবিজ ঝোলানো

আমাদের সমাজের কিছু এলাকায় মহররমের ১০ তারিখে ঘরবাড়ি, গবাদি পশু বা শিশুদের বালা-মুসিবত ও বদনজর থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিশেষ সুতো বাঁধা, লোহা ঝুলিয়ে রাখা বা বিভিন্ন তাবিজ-কবজ ব্যবহার করার প্রচলন রয়েছে। অথচ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে এ ধরনের কাজের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। একজন মুসলিমের বিশ্বাস হলো, উপকার ও অপকারের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। কোনো সুতো, লোহা বা বস্তু নিজস্বভাবে মানুষের ক্ষতি দূর করতে বা বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না। আর যদি কেউ এসব বস্তুর মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত কারণ ছাড়া নিজস্ব রক্ষাকারী ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে, তবে তা তাওহীদের পরিপন্থী এবং গুরুতর গুনাহের কাজ, এগুলো শির্কের পর্যায়ে চলে যেতে পারে

৮. এই দিনে গোসল বা চোখে সুরমা দেওয়াকে বিশেষ ইবাদত মনে করা

কোনো কোনো এলাকায় বিশ্বাস করা হয় যে, আশুরার দিনে গোসল করলে সারা বছর কোনো রোগব্যাধি হয় না এবং চোখে সুরমা দিলে চোখ ভালো থাকে। এই প্রথাগুলো মূলত বনী উমাইয়াদের যুগের কিছু অতিউৎসাহী মানুষের তৈরি করা, যা পরবর্তীতে ইবাদত হিসেবে সমাজে স্থান করে নিয়েছে। সাধারণ গোসল বা সুরমা পরা জায়েজ হলেও, এই দিনে একে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করা বেদাত।

৯. কারবালার স্মরণে পানি পানের বিশেষ কৃত্রিম সাবিল তৈরি

হযরত হোসাইন (রা.) পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন—এই আবেগকে পুঁজি করে অনেকে রাস্তায় রাস্তায় পানি ও শরবতের কৃত্রিম দোকান (সাবিল) খুলে বসেন এবং মনে করেন এটি এই দিনের একটি বিশেষ ধর্মীয় কাজ। তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো সবসময়ই সওয়াবের কাজ, কিন্তু একে নির্দিষ্টভাবে আশুরার দিনের বিশেষ ইবাদত বা উৎসবের অংশ মনে করা একটি নতুন সংযোজন বা বেদাত।

১০. হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা.) সহ অন্য সাহাবিদের গালিগালাজ করা

কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর মানুষ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মানিত সাহাবি হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-কে গালিগালাজ করে এবং কাফের বা ফাসেক বলে (নাউজুবিল্লাহ)। রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের গালি দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। ইয়াজিদের ভুল বা অপরাধের দায়ভার কোনোভাবেই একজন জালিলুল কদর সাহাবির ওপর চাপানো যাবে না। সাহাবিদের প্রতি কটুূক্তি করা ঈমান ধ্বংসের কারণ।

উপসংহার: কুসংস্কার মুক্ত হয়ে সুন্নাহর আলোয় ফিরুন

প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, মহররম মাস আমাদের আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা (রোজার মাধ্যমে) এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার শিক্ষা দেয়; উৎসব, মাতম বা কুসংস্কারের নয়। আসুন, আমরা আমাদের আবেগ ও ভালোবাসাকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ফ্রেমে আবদ্ধ করি। সমাজের বুক থেকে এই সমস্ত বেদাআত দূর করতে নিজে সচেতন হই এবং অন্যদেরও সচেতন করি।

আপনার একটি শেয়ার হয়তো অনেক মুসলিম ভাইকে এই মারাত্মক বেদাত ও কুসংস্কারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। দ্বীনি দায়িত্ব মনে করে আর্টিকেলটি এখনই আপনার বন্ধুদের সাথে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অবশ্যই শেয়ার করুন।