জিহ্বা ও লজ্জাস্থান— এই দুটি বিষয় মানুষের জান্নাত বা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুইটি হেফাজতের বিনিময়ে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন। কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত জানুন।
মানুষের জীবনে অসংখ্য গুনাহ রয়েছে, কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়— অনেক বড় বড় গুনাহের পেছনে দুটি জিনিস সবচেয়ে বেশি দায়ী।
একটি হলো— জিহ্বা। আর অন্যটি হলো— লজ্জাস্থান ও প্রবৃত্তি।
অনেক সময় মানুষ একটি কথার মাধ্যমে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলে, আবার অনেক সময় প্রবৃত্তির অনুসরণ তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুটি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এবং বলেছেন:-
এই হাদিসটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ পুরো শরীরের কথা বলেননি— বরং বিশেষভাবে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের কথা বলেছেন।
কারণ মানুষের অধিকাংশ গুনাহ এই দুইটির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়।
জিহ্বা মানুষের শরীরের ছোট একটি অঙ্গ, কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
একটি সুন্দর কথা যেমন মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, তেমনি একটি ভুল কথাও সম্পর্ক নষ্ট করতে, শত্রুতা সৃষ্টি করতে এবং একজন মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই ইসলাম জিহ্বা ব্যবহারের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
মিথ্যা বলা, গীবত করা, অপবাদ দেওয়া, কটু কথা বলা, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা, মানুষকে কষ্ট দেওয়া, ঝগড়া সৃষ্টি করা— এসবই জিহ্বার গুনাহ।
অনেক সময় মানুষ মনে করে— “আমি তো শুধু একটা কথাই বলেছি।” কিন্তু সেই একটি কথাই কারো হৃদয় ভেঙে দিতে পারে অথবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, আমাদের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছে লিপিবদ্ধ হচ্ছে।
মানুষ হয়তো নিজের কথা ভুলে যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথাই হারিয়ে যায় না।
এই কারণেই একজন মুমিনের উচিত— কথা বলার আগে চিন্তা করা।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“বান্দা কখনো এমন কথা বলে,
যার পরিণতি সম্পর্কে সে চিন্তা করে না,
ফলে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।”
— সহিহ বুখারি: ৬৪৭৭
খেয়াল করুন— একটি কথাই মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
কারণ জিহ্বার গুনাহ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ক্ষতি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
আবার জিহ্বা দিয়েই সবচেয়ে বেশি ইবাদতও করা হয়— যেমন কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দো‘আ এবং সত্য কথা বলা।
অর্থাৎ, এই জিহ্বাই হতে পারে জান্নাতের কারণ, আবার এটিই হতে পারে ধ্বংসের কারণ।
তাই একজন সচেতন মুমিনের উচিত— প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কথা না বলা এবং এমন সব কথা থেকে বিরত থাকা, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।
কারণ কখনো কখনো— একটি কথাই মানুষের আখিরাত বদলে দিতে পারে।
ইসলাম মানুষের পবিত্রতা, চরিত্র এবং আত্মসম্মান রক্ষার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
এই কারণেই কুরআন ও সুন্নাহতে লজ্জাস্থান হেফাজতের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
বর্তমান যুগে ফিতনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে।
মোবাইল, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অশ্লীল পরিবেশের কারণে মানুষ খুব সহজেই হারামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
অনেক সময় মানুষ বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়, কিন্তু বাস্তবে এটি ঈমান, অন্তর এবং চরিত্রের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই কারণেই লজ্জাস্থান হেফাজত করা আজকের যুগে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মুমিনদের অন্যতম বড় গুণ হিসেবে লজ্জাস্থান হেফাজতের কথা উল্লেখ করেছেন।
এটি প্রমাণ করে— পবিত্রতা শুধু একটি সামাজিক বিষয় নয়, বরং এটি ঈমান ও তাকওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লজ্জাস্থান হেফাজত মানে শুধু যিনা থেকে দূরে থাকাই নয়— বরং এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকা, যা মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যায়।
কারণ বড় গুনাহ সাধারণত হঠাৎ করে শুরু হয় না।
প্রথমে দৃষ্টি, তারপর চিন্তা, এরপর কল্পনা, তারপর আসক্তি— এভাবেই মানুষ ধীরে ধীরে গুনাহের দিকে এগিয়ে যায়।
এই কারণেই ইসলাম শুরুতেই গুনাহের দরজাগুলো বন্ধ করতে শিক্ষা দেয়।
চোখ সংযত রাখা, অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা এড়িয়ে চলা, হারাম কন্টেন্ট থেকে দূরে থাকা— এসবই লজ্জাস্থান হেফাজতের অংশ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“চোখেরও যিনা আছে,
আর তার যিনা হলো তাকানো…”
— সহিহ মুসলিম: ২৬৫৭
এই হাদিস আমাদেরকে বুঝায়— বড় গুনাহের সূচনা অনেক সময় ছোট একটি দৃষ্টি থেকেই হয়।
যখন একজন মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তখন সে শুধু একটি গুনাহ থেকে বাঁচে না— বরং নিজের অন্তর, ঈমান এবং চরিত্রকেও সুরক্ষিত রাখে।
বর্তমান সমাজে যেখানে অশ্লীলতা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেখানে নিজের পবিত্রতা রক্ষা করা একজন মুমিনের জন্য বড় ইবাদত ও সংগ্রাম।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম প্রতিদান প্রস্তুত করে রাখেন।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়— মানুষের অধিকাংশ সমস্যা, ঝগড়া, পাপ ও ধ্বংসের পেছনে এই দুইটি বিষয় জড়িত।
জিহ্বা মানুষকে অন্যের হক নষ্ট করতে শেখায়, আর প্রবৃত্তি মানুষকে সীমালঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যায়।
যে ব্যক্তি এই দুইটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে আসলে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
আর নফসকে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো তাকওয়ার বড় নিদর্শন।
জিহ্বা ও লজ্জাস্থান হেফাজত করা সহজ নয়— কারণ এগুলোর সাথে মানুষের নফস ও অভ্যাস জড়িত।
তবে একজন মানুষ যদি সচেতনভাবে চেষ্টা করে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে, তাহলে ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় উল্লেখ করা হলো— যা একজন মুমিনকে গুনাহ থেকে বাঁচতে সাহায্য করতে পারে।
মনে রাখতে হবে— নিজেকে হেফাজত করা একদিনের কাজ নয়। এটি একটি চলমান সংগ্রাম।
যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন।
জিহ্বা ও লজ্জাস্থান— এই দুটি বিষয় ছোট মনে হলেও মানুষের জান্নাত বা জাহান্নামের কারণ হতে পারে।
এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুইটি হেফাজতের বিনিময়ে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন।
তাই একজন সচেতন মুমিনের উচিত— নিজের কথা, দৃষ্টি ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর ভয় নিয়ে জীবন পরিচালনা করা।
হয়তো একটি কথাই আমাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে, আবার একটি সংযমই হতে পারে জান্নাতের পথ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থান হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
যদি এই আর্টিকেলটি আপনার উপকারে আসে, তাহলে এটি শেয়ার করুন— হয়তো আপনার মাধ্যমে আরেকজন উপকৃত হবে।