বিদআত কি? বিদআতের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ এবং চেনার সহজ উপায়

বিদআত কি এবং তা চেনার উপায়

আমাদের সমাজে প্রায়ই একটি প্রশ্ন শোনা যায়—"অমুক কাজটি কি বিদআত?" অথবা "ভালো নিয়তে নতুন কোনো ইবাদত করলে সমস্যা কোথায়?" এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু ভালো নিয়ত থাকলেই কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না; সেই আমলটি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়াও আবশ্যক। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ আন্তরিকতার সঙ্গে এমন কিছু আমল করে, যা ইসলামের অংশ মনে করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মাহকে বিদআত সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছেন এবং সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকেই সুন্নাহ ও বিদআতের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। আসুন, কুরআন, সহীহ হাদিস এবং প্রখ্যাত আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে জেনে নিই—বিদআত কী, এর প্রকৃত সংজ্ঞা কী, এটি কীভাবে চিহ্নিত করা যায় এবং একজন মুসলিম কীভাবে বিদআত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।

১. বিদআত শব্দের অর্থ ও সংজ্ঞা কি?

আভিধানিক অর্থ: ‘বিদআত’ (بدعة) আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো—পূর্বে কোনো নমুনা বা অস্তিত্ব ছাড়াই সম্পূর্ণ নতুন কোনো কিছু তৈরি করা।

শরিয়তের পরিভাষায়: শরিয়তের নামে দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন নিয়ম, পদ্ধতি বা আমল চালু করা, যা দেখতে ইসলামি শরিয়তের মতো মনে হয় এবং যার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন, অধিক ইবাদত করা বা বেশি সওয়াব লাভ করা—এ ধরনের নতুন সংযোজনকে বিদআত বলা হয়।

সহজ কথায়, যে কাজের কোনো প্রমাণ কুরআন, সহীহ হাদিস, সাহাবায়ে কিরামের আমল বা ইসলামের প্রথম যুগের (সালাফে সালেহীনদের) অনুসরণে পাওয়া যায় না, অথচ তাকে সওয়াবের উদ্দেশ্যে দ্বীনের অংশ হিসেবে পালন করা হয়, সেটিই বিদআত।

২. বিদআত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কঠোর বাণী

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে নতুন কোনো কিছু যোগ বা বিয়োগ করার অধিকার কারো নেই। বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন:

“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন বিষয় তৈরি করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানযোগ্য (বাতিল)।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৬৯৭

অন্য একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ খুতবা দেওয়ার সময় বলতেন:

“নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর পথনির্দেশ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন। আর প্রতিটি বিদআতই হলো গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা (এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতার ঠিকানা জাহান্নাম)।”
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৭

৩. বিদআতের প্রকারভেদ: দ্বীনি বিদআত বনাম দুনিয়াবী আবিষ্কার

বিদআত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকেই একটি সাধারণ ভুল করে থাকেন। তারা প্রশ্ন করেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে তো বিমান, লাউডস্পিকার, মোবাইল, কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ছিল না। তাহলে এগুলো ব্যবহার করাও কি বিদআত?

এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি জানা জরুরি। ইসলামে দুনিয়াবী বিষয় এবং দ্বীনি ইবাদতের বিষয় এক নয়। এ দুটির বিধানও ভিন্ন।

১. দুনিয়াবী বিষয় (অভ্যাস, প্রযুক্তি ও উপকরণ)

খাদ্য, পোশাক, যানবাহন, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, লাউডস্পিকার ইত্যাদি দুনিয়াবী বিষয়। এসব ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো—

দুনিয়ার সবকিছু বৈধ (মুবাহ), যতক্ষণ না কুরআন বা সহীহ সুন্নাহর কোনো দলিল সেটিকে হারাম ঘোষণা করে।

তাই আধুনিক প্রযুক্তি, যানবাহন বা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা বিদআত নয়। বরং এগুলো বৈধ কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

২. দ্বীনি বিষয় (ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের আমল)

ইবাদতের ক্ষেত্রে বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ইবাদত, তার সময়, সংখ্যা, পদ্ধতি বা বিশেষ ফজিলত নিজের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা বৈধ নয়। বরং ইবাদত কেবল সেইভাবেই করা যাবে, যেভাবে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন।

ইবাদতের মূলনীতি হলো—কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দলিল ছাড়া কোনো নতুন ইবাদত বা ইবাদতের নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা বৈধ নয়।

এ কারণে নামাজের রাকাত বৃদ্ধি করা, শরিয়তে নির্ধারিত নয় এমন কোনো নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ রোজা, বিশেষ দোয়া, যিকির বা অনুষ্ঠানকে সওয়াবের কাজ হিসেবে চালু করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

এ বিষয়ে সহীহ বুখারীর একটি শিক্ষণীয় হাদিস

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী ﷺ-এর ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য তাঁর স্ত্রীদের নিকট উপস্থিত হলেন। তাঁদেরকে যখন নবী ﷺ-এর ইবাদতের কথা জানানো হলো, তখন তারা তা নিজেদের কাছে কম মনে করলেন এবং বললেন, "রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।"

তখন তাদের একজন বলল, "আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করব।"
অপরজন বলল, "আমি সবসময় রোজা রাখব, কখনো বিরতি দেব না।"
আরেকজন বলল, "আমি কখনো বিয়ে করব না।"

পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ এসে বললেন,

"তোমরাই কি সেই লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে অধিক ভয় করি এবং তাঁর প্রতি অধিক অনুগত। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার রোজা না-ও রাখি; আমি সালাত আদায় করি এবং ঘুমাই; আর আমি নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"

— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৬৩

হাদিস থেকে শিক্ষা

এই হাদিসে তিনজন সাহাবী (রাঃ) অত্যন্ত ভালো নিয়ত নিয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজেদের ইবাদত আরও বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বেশি বেশি ইবাদত করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। কিন্তু তাঁরা যে পদ্ধতি গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, তা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে সংশোধন করে বুঝিয়ে দিলেন যে, শুধু ভালো নিয়ত থাকলেই কোনো আমল গ্রহণযোগ্য হয় না; আমলটি অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে। ইখলাস (বিশুদ্ধ নিয়ত) যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ (ইত্তিবা) করাও সমানভাবে অপরিহার্য। এই দুই শর্ত পূরণ হলেই কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার আশা করা যায়।

অতএব, ইসলামে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ইবাদত, নতুন পদ্ধতি, নতুন সময় বা নতুন নিয়ম নির্ধারণ করা বৈধ নয়। প্রকৃত ইবাদত হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই ইবাদত করা। তাঁর সুন্নাহই মুমিনের জন্য সর্বোত্তম, পরিপূর্ণ ও নিরাপদ অনুসরণীয় পথ।

৪. বিদআত চেনার সহজ ৪টি উপায়

কোনো একটি আমল সুন্নাহ নাকি বিদআত—তা বুঝতে অনেক সময় মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তবে শরিয়তের কয়েকটি সহজ নীতির মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব। যদি কোনো ইবাদতের সময়, সংখ্যা, পদ্ধতি বা স্থান শরিয়তের দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় এবং সেই নির্ধারিত পদ্ধতিতেই ইবাদত করাকে বেশি সওয়াবের কাজ বা আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম মনে করা হয়, তাহলে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

১. সময় নির্ধারণ করা (Timing)

যে ইবাদতের জন্য শরিয়ত কোনো নির্দিষ্ট দিন, রাত বা সময় নির্ধারণ করেনি, সেটিকে নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো সময়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট করে দেওয়া বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

উদাহরণ: নির্দিষ্ট কোনো রাতে বিশেষ ফজিলতের বিশ্বাসে এমন নফল নামাজ, দোয়া বা ইবাদতের প্রচলন করা, যার পক্ষে কুরআন বা সহীহ হাদিসে কোনো দলিল নেই।

২. সংখ্যা নির্ধারণ করা (Quantity)

কোনো দোয়া, যিকির বা আমলের সংখ্যা যদি শরিয়ত নির্ধারণ না করে থাকে, তাহলে নিজের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দিয়ে বিশেষ সওয়াব বা বিশেষ ফলাফলের বিশ্বাস করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

উদাহরণ: "এই দোয়াটি ঠিক ৪১ বার, ১০১ বার বা ১০০১ বার পড়লে অমুক অলৌকিক ফল পাওয়া যাবে"—এমন বিশ্বাসের পক্ষে সহীহ দলিল না থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

৩. পদ্ধতি নির্ধারণ করা (Method)

ইবাদতের পদ্ধতিও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে। কোনো ইবাদতের এমন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা, যা তিনি বা সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) পালন করেননি, তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

উদাহরণ: যিকির একটি মহান ইবাদত। কিন্তু নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে, সমস্বরে, শরীর দুলিয়ে বা বিশেষ নিয়ম তৈরি করে যিকির করাকে দ্বীনের অংশ মনে করা—যদি তার পক্ষে সহীহ দলিল না থাকে—তাহলে তা সুন্নাহ নয়।

৪. স্থান নির্ধারণ করা (Place)

কোনো ইবাদতের জন্য শরিয়ত যেসব স্থানের বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত নির্ধারণ করেছে, সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো স্থানকে নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ সওয়াবের স্থান মনে করা বা সেখানে ইবাদত করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে—এমন বিশ্বাস করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

উদাহরণ: কোনো কবর, মাজার, পীরের আস্তানা, নির্দিষ্ট গাছ, পাহাড় বা অন্য কোনো স্থান সম্পর্কে এই বিশ্বাস করা যে, সেখানে নামাজ, দোয়া বা যিকির করলে অন্য জায়গার তুলনায় বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে—অথচ এর পক্ষে কুরআন বা সহীহ সুন্নাহর কোনো দলিল নেই—তাহলে এ ধরনের বিশ্বাস ও আমল বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসা-এর বিশেষ ফজিলত কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই এসব স্থানে ইবাদতের জন্য সফর করা সুন্নাহ; কিন্তু শরিয়তের দলিল ছাড়া অন্য কোনো স্থানকে একই ধরনের বিশেষ ফজিলতের স্থান মনে করা বৈধ নয়।

মনে রাখার সহজ সূত্র

ইবাদতের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সময়, সংখ্যা, পদ্ধতি বা স্থান নির্ধারণ করার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—"এর পক্ষে কি কুরআন, সহীহ হাদিস বা সাহাবায়ে কিরামের আমলের কোনো প্রমাণ আছে?" যদি উত্তর 'না' হয়, তাহলে সেই আমল থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।

একজন মুসলিমের করণীয় কী?

আল্লাহ তাআলা কুরআন ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহকে আমাদের জন্য হিদায়াতের পথ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, নিজের সকল ইবাদত ও আমল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী করার চেষ্টা করা।

একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন—আমরা কি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত সব ইবাদত ও সুন্নাহর ওপর সম্পূর্ণ আমল করতে পেরেছি? ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, নফল ইবাদত, সকাল-সন্ধ্যার যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, উত্তম চরিত্র—এসব কি আমরা পূর্ণভাবে পালন করতে পেরেছি?

যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে আমাদের উচিত আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ শেখানো সুন্নাহগুলোকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। যে ইবাদতগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলোই সম্পূর্ণভাবে পালন করা আমাদের জন্য যথেষ্ট। নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো পদ্ধতি, নিয়ম বা ইবাদত উদ্ভাবনের প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বেশি আমল করতে বলেননি; বরং সর্বোত্তম ও বিশুদ্ধ আমল করতে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে সর্বোত্তম।"

— সূরা আল-মুলক, আয়াত: ২

অতএব, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য আমল হলো সেই আমল, যা ইখলাসের (বিশুদ্ধ নিয়ত) সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পাদিত হয়। তাই নতুন কোনো ইবাদত উদ্ভাবনের পরিবর্তে আমাদের উচিত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর অনুসরণে নিজের জীবন গড়ে তোলা।

৫. বিদআতের কুফল বা ক্ষতি

বিদআত কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে মানুষের দ্বীনকে বিকৃত করে এবং তাকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্য সালাফে সালেহীন বিদআত থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার উপদেশ দিয়েছেন। বিদআতের কয়েকটি বড় ক্ষতি নিচে তুলে ধরা হলো।

১. সুন্নাহ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে

যখন মানুষ সুন্নাহ ছেড়ে নতুন নতুন ইবাদত ও প্রথা চালু করে, তখন আস্তে আস্তে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকৃত সুন্নাহ মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।

হাসান ইবনু আতিয়্যাহ (রহ.) বলেন,

"কোনো জাতি যখনই তাদের দ্বীনের মধ্যে একটি বিদআত চালু করে, তখন আল্লাহ তাদের কাছ থেকে অনুরূপ একটি সুন্নাহ উঠিয়ে নেন। এরপর কিয়ামত পর্যন্ত সেই সুন্নাহ তাদের কাছে ফিরে আসে না।"

— সুনান আদ-দারিমী, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৯৯ ( বিভিন্ন সংস্করণে নম্বর ভিন্ন হতে পারে)

২. বিদআতযুক্ত ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না

ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য—এক. আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধ নিয়ত (ইখলাস) এবং দুই. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ (ইত্তিবা)। তাই যে ইবাদতের ভিত্তি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ নয়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

৩. হাউজে কাউসারের পানি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের কিছু মানুষ হাউজে কাউসারের কাছে আসবে। কিন্তু তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলবেন,

"হে আমার রব! এরা তো আমার উম্মত।"

তখন তাঁকে বলা হবে, "আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা দ্বীনের মধ্যে কী পরিবর্তন (নতুন বিষয়) সৃষ্টি করেছিল।"

— সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদিস: ৬৫৮২; সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাহারাহ/ফাযাইল (হাউজ সংক্রান্ত অধ্যায়), হাদিস: ২৩০৪

এই হাদিস আমাদের জন্য কঠিন সতর্কবার্তা। তাই একজন মুমিনের উচিত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ইবাদত, পদ্ধতি বা প্রথা সংযোজন করা থেকে বিরত থাকা।

৪. বিদআত তাওবার পথে বাধা হতে পারে

যে ব্যক্তি বিদআতকে ইবাদত ও সওয়াবের কাজ মনে করে, সে অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে ভুল করছে। ফলে তার তাওবা করার সুযোগও কমে যায়। তাই বিদআত থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের প্রতিটি আমল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

ইসলামে আবেগের চেয়ে ‘অনুসরণের’ মূল্য বেশি। আমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাই, তবে আমাদের নিজের মনগড়া উপায়ে নয়, বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দেখানো পদ্ধতিতেই ইবাদত করতে হবে। বিদআত মুক্ত আমল অল্প হলেও তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আসুন, আমরা যেকোনো আমল করার আগে তার সহীহ দলিল জেনে নিই এবং সমাজকে বিদআতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার এবং সকল প্রকার বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

আপনার বন্ধুর মতো আরও অনেকের মনেই হয়তো বিদআত নিয়ে এই প্রশ্নটি রয়েছে। হকের এই বাণীটি ছড়িয়ে দিতে এবং অন্য মুসলিম ভাইদের আমল পরিশুদ্ধ করতে আর্টিকেলটি এখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।