অজু ছাড়া মোবাইলে কুরআন মাজীদ পড়া যাবে কি?




আধুনিক যুগে মোবাইল, ট্যাব ও ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে কুরআন মাজীদ পড়া মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্ন সামনে আসে— অজু ছাড়া মোবাইলে কুরআন মাজীদ পড়া কি শরিয়তসম্মত? এই আর্টিকেলে কুরআন, সহীহ হাদিস, চার মাযহাব ও সমসাময়িক আলেমদের মতামতের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।



কুরআন মাজীদ আল্লাহ তাআলার কালাম— যা সকল মুসলিমের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র গ্রন্থ। তাই কুরআন তিলাওয়াত, স্পর্শ ও বহনের ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট আদব ও বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে।



তবে পূর্বের যুগে কুরআন কেবল কাগজের মুসহাফেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজ যখন কুরআন মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল স্ক্রিনে চলে এসেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই বিষয়ে নতুন ফিকহি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।



কাগজের মুসহাফ স্পর্শ করার শরিয়তী বিধান

لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ
“পবিত্ররা ছাড়া কেউ একে স্পর্শ করে না।”
— সূরা আল-ওয়াক্বিয়া, আয়াত ৭৯


সাহাবায়ে কেরাম ও চার মাযহাবের অধিকাংশ ফকিহ এই আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করে বলেছেন— অজু ছাড়া কাগজের কুরআন (মুসহাফ) স্পর্শ করা জায়েয নয়। এই বিষয়ে উম্মাহর মাঝে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে।



রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না।”
(মুয়াত্তা ইমাম মালিক; ইমাম নববী ও ইবনে আবদুল বার একে গ্রহণযোগ্য বলেছেন)



মোবাইলের কুরআন কি শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসহাফ?

এখানেই মূল ফিকহি পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি। কাগজের মুসহাফে কুরআনের অক্ষর স্থায়ীভাবে লিখিত থাকে, যা সরাসরি স্পর্শ করা হয়।



কিন্তু মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিনে কুরআনের অক্ষর স্থায়ী নয়; স্ক্রিন বন্ধ করলে তা অদৃশ্য হয়ে যায়। ব্যবহারকারী বাস্তবে কুরআনের অক্ষর স্পর্শ করেন না, বরং স্পর্শ করেন একটি কাঁচের পর্দা।



এই কারণেই চার মাযহাবের বহু ফকিহ ও সমসাময়িক আলেমদের মতে— ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত কুরআন কাগজের মুসহাফের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়



চার মাযহাব ও আলেমদের আলোকে ফিকহি সিদ্ধান্ত

  • অজু ছাড়া কাগজের কুরআনের অক্ষর স্পর্শ করা ❌ জায়েয নয়
  • অজু ছাড়া মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত করা ✅ জায়েয
  • অজু সহ তিলাওয়াত করা ⭐ অধিক সওয়াব ও আদবপূর্ণ


হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী— চার মাযহাবেই মূল নীতিটি এক: কুরআনের অক্ষর সরাসরি স্পর্শের ক্ষেত্রে পবিত্রতা জরুরি, কিন্তু ডিজিটাল পাঠে সেই হুকুম প্রযোজ্য নয়।



জানাবত অবস্থায় মোবাইলে কুরআন পড়ার বিধান

জানাবত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে অধিকাংশ আলেমের মত হলো— সরাসরি তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকা উত্তম, এমনকি মোবাইল থেকেও।



তবে এই অবস্থায় দোয়া, যিকির, কুরআনের তাফসির ও অনুবাদ পড়া বৈধ বলে আলেমগণ উল্লেখ করেছেন।



নারীদের হায়েজ অবস্থায় মোবাইলে কুরআন

হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।



কিছু আলেমের মতে— শিক্ষা, হিফজ বা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে মোবাইল থেকে কুরআন পড়া জায়েয। আবার অনেক আলেম সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।



তাই এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ মাযহাব ও নির্ভরযোগ্য আলেমের ফতোয়া অনুসরণ করাই উত্তম



উপসংহার

সারসংক্ষেপে বলা যায়— অজু ছাড়া মোবাইলে কুরআন মাজীদ পড়া শরিয়তসম্মত ও বৈধ। তবে অজু নিয়ে পড়া অধিক সম্মানজনক এবং সওয়াবের দিক থেকে উত্তম।



কুরআন যেভাবেই পড়া হোক— আমাদের কর্তব্য হলো অন্তরে খুশু, বাহ্যিক আদব ও আল্লাহর কালামের প্রতি গভীর সম্মান বজায় রাখা।