আধুনিক যুগে মোবাইল, ট্যাব ও ডিজিটাল বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পবিত্র কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়— অজু ছাড়া মোবাইলে কুরআন মাজীদ পড়া বা স্ক্রিন স্পর্শ করা কি শরিয়তসম্মত? কুরআন, সহীহ হাদিস এবং সমসাময়িক আলেমদের নির্ভরযোগ্য মতামতের আলোকে বিষয়টি এখানে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পবিত্র কুরআন মাজীদ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার চিরন্তন কালাম— যা প্রতিটি মুসলিমের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত এবং পবিত্র গ্রন্থ। তাই কুরআন তিলাওয়াত, স্পর্শ ও তা বহনের ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট আদব এবং সুস্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে পূর্বের যুগে পবিত্র কুরআন কেবল কাগজের তৈরি ‘মুসহাফ’ বা গ্রন্থ আকারেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে যখন কুরআন মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল স্ক্রিনের অ্যাপে চলে এসেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমসাময়িক সময়ে এই বিশেষ মাসআলাটি নিয়ে ফিকহি আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনের মর্যাদা রক্ষার্থে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
সাহাবায়ে কেরাম এবং চার মাযহাবের প্রায় সমস্ত ফকিহ ও আলেম এই আয়াত এবং অন্যান্য হাদিস থেকে দলিল গ্রহণ করে বলেছেন— **অজু ছাড়া কাগজের তৈরি মূল কুরআন (মুসহাফ) সরাসরি স্পর্শ করা জায়েয নয়**। এই বিষয়ে উম্মাহর আলেমদের মাঝে স্পষ্ট ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন— “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন কুরআন স্পর্শ না করে।” (মুয়াত্তা ইমাম মালিক; ইমাম নববী ও ইবনে আবদুল বার এই হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন)।
ডিজিটাল স্ক্রিনে কুরআন পড়ার ক্ষেত্রে আসল ফিকহি পার্থক্যটি ভালোভাবে বোঝা জরুরি। কাগজের তৈরি মুসহাফে পবিত্র কুরআনের অক্ষরগুলো স্থায়ীভাবে কালির মাধ্যমে লিখিত থাকে, যা আমরা হাত দিয়ে সরাসরি স্পর্শ করি।
কিন্তু মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে কুরআনের অক্ষরগুলো স্থায়ী কোনো বিষয় নয়; বরং এগুলো আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে ভেসে ওঠে এবং স্ক্রিন লক বা অ্যাপ বন্ধ করলেই তা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। তাছাড়া, একজন ব্যবহারকারী স্ক্রিনে টাচ করার সময় বাস্তবে কুরআনের অক্ষর স্পর্শ করেন না, বরং ডিভাইসের ওপর থাকা একটি সাধারণ কাঁচের বা প্লাস্টিকের প্রোটেক্টিভ পর্দা স্পর্শ করেন।
ঠিক এই সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণেই সমসাময়িক যুগের বিশ্বখ্যাত ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি ও ফকিহদের মতে— **ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত কুরআনের এই রূপটি সরাসরি কাগজের মুসহাফের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়**।
ডিজিটাল মাধ্যম এবং কাগজের মাধ্যমের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে আলেমগণ বিষয়টিকে এভাবে বিন্যস্ত করেছেন:
যদি কোনো ব্যক্তি জানাবত (ফরজ গোসল জরুরি হওয়া) অবস্থায় থাকেন, তবে তার জন্য মুখে বা আওয়াজ করে কুরআন তিলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক, তা সাধারণ মুসহাফ দেখেই হোক কিংবা মোবাইলের স্ক্রিন দেখেই হোক।
তবে এই বিশেষ অবস্থায় অন্তরে চিন্তা করা বা চোখ দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের লেখা কোনো প্রকার উচ্চারণ ছাড়া রিডিং পড়া, কিংবা কুরআনের তাফসির ও অনুবাদ পড়ার অনুমতি আলেমগণ দিয়েছেন।
নারীদের হায়েজের দিনগুলোতে কুরআন তিলাওয়াতের বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অনেক সমসাময়িক আলেমের মতে— যারা দ্বীনি শিক্ষার সাথে জড়িত, হিফজ করছেন কিংবা তিলাওয়াত না করলে ভুলে যাওয়ার স্পষ্ট আশঙ্কা রয়েছে, তারা এই দিনগুলোতে সরাসরি কাগজের মুসহাফ স্পর্শ না করে মোবাইল অ্যাপের সাহায্য নিয়ে পড়া চালিয়ে যেতে পারবেন।
তবে সাধারণ অবস্থায় কোনো বিশেষ জরুরি প্রয়োজন না থাকলে সতর্কতা অবলম্বন করে এই দিনগুলোতে তিলাওয়াত থেকে বিরত থেকে বেশি বেশি জিকির-আজকার ও ইস্তিগফার করাই উত্তম।
সারসংক্ষেপে বলা যায়— অজু ছাড়া মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে পবিত্র কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা এবং স্ক্রিনে টাচ করা শরিয়তসম্মতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ। এতে কোনো গুনাহ হবে না। তবে মনে রাখতে হবে, বাহ্যিক মাধ্যমটি ডিজিটাল হলেও এটি মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী; তাই তিলাওয়াতের সময় অন্তরে আল্লাহর ভয়, বাহ্যিক মার্জিত পোশাক এবং গভীর সম্মান বজায় রাখা আমাদের সকলের ঈমানী দায়িত্ব।