জিকির কী, কেন ও কীভাবে করবেন: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর জিকির করার সঠিক নিয়ম ও ফজিলত

মানবদেহের সুস্থতার জন্য যেমন আলো-বাতাস ও খাবারের প্রয়োজন, তেমনি মানব অন্তরের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক জীবনের মূল সঞ্জীবনী শক্তি হলো মহান আল্লাহর জিকির। ইসলামে প্রায় প্রতিটি ইবাদতের একটি নির্দিষ্ট সময় ও পরিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও একমাত্র জিকিরের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা কোনো সীমারেখা টানেননি; বরং মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন সর্বাবস্থায় বেশি বেশি জিকির করতে। তবে জিকির কেবল মুখে কিছু শব্দের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়, এর রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক অর্থ। আসুন কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে জিকির কী, কেন আমরা জিকির করব এবং কীভাবে সুন্নাহসম্মত উপায়ে তা আদায় করব—তা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

১. কুরআনে বেশি বেশি জিকিরের আল্লাহর নির্দেশ

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুমিনদের প্রতি বিশেষভাবে বেশি বেশি জিকির করার তাগিদ দিয়েছেন। সূরা আল-আহযাবে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا ۝ وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।”
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪১-৪২

মুমিনদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন—“যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে...” (সূরা আলে ইমরান: ১৯১)। অর্থাৎ জীবনের কোনো অবস্থাতেই মুমিন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকে না।

২. জিকির কী? (প্রকৃত তাৎপর্য ও স্তরসমূহ)

আরবি ‘জিকর’ (ذكر) শব্দের মূল অর্থ হলো স্মরণ করা, মনে রাখা, আলোচনা করা বা বিস্মৃতি দূর করা। ইসলামি পরিভাষায় জিকির কেবল তসবিহ টেপা নয়, বরং এটি তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত:

  • লিসানি জিকির (জিহ্বার দ্বারা স্মরণ):
    সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার পাঠ করা, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং নবীজি ﷺ-এর শেখানো মাসনূন দোয়া ও ইস্তিগফার মুখে উচ্চারণ করা।
  • ক্বলবি জিকির (অন্তরের দ্বারা স্মরণ):
    অন্তরের গভীরে আল্লাহর অস্তিত্ব, মহত্ত্ব, অসীম নিয়ামত এবং তাঁর শাস্তির ভয় জাগ্রত রাখা। কোনো নির্জন মুহূর্তেও মনে রাখা যে ‘আল্লাহ আমাকে দেখছেন’—এটিই হলো অন্তরের সর্বোচ্চ জিকির।
  • আমলি জিকির (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আনুগত্যমূলক জিকির):
    আল্লাহর সমস্ত ফরজ বিধান (সালাত, সিয়াম, সততা, পর্দা) নিষ্ঠার সাথে পালন করা এবং হারাম বিষয়গুলো বর্জন করা। আমলহীন কেবল মৌখিক উচ্চারণকে পূর্ণাঙ্গ জিকির বলা যায় না। প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) এই বাস্তবমুখী জিকিরের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন:
    “আল্লাহর আনুগত্যই হলো জিকির। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করল, সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর জিকির করল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করল না, সে জিকিরকারী নয়—যদিও সে প্রচুর পরিমাণে তাসবিহ পাঠ করে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে।”
    — তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫২-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

৩. আমরা কেন জিকির করব? (উপকারিতা ও ফজিলত)

কুরআন ও সহীহ হাদিসে জিকিরকারী বান্দাদের জন্য প্রভূত আত্মিক ও পরকালীন সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে:

  • অন্তরের অতল প্রশান্তি:
    আধুনিক জীবনের মানসিক ক্লান্তি, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর করার মহাঔষধ হলো আল্লাহর জিকির। কুরআনে বলা হয়েছে:

    أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

    “জেনে রেখো! আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ পরম প্রশান্তি লাভ করে।”
    — পবিত্র কুরআন, সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ২৮
  • জীবিত ও মৃতের পার্থক্য:
    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃতের মতো।” (সহীহ বুখারী: ৬৪০৭)। জিকিরবিহীন অন্তর মূলত একটি প্রাণহীন লাশের মতো।
  • আল্লাহর সান্নিধ্য ও স্মরণ লাভ:
    আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—“তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫২)। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, বান্দা যখন আল্লাহকে মনে মনে স্মরণ করে, আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন; আর বান্দা যখন কোনো সমাবেশে স্মরণ করে, আল্লাহ তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ সমাবেশে (ফিরিশতাদের মাঝে) তাকে স্মরণ করেন (সহীহ মুসলিম: ২৬৭৫)।
  • শয়তানের ধোঁকা ও আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা:
    জিকির হলো মুমিনের শক্তিশালী দুর্গ। বান্দা যখন জিকির করে, শয়তান তখন পালিয়ে যায়; আর যখনই সে গাফেল হয়, শয়তান তখন অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়।

৪. কীভাবে জিকির করব? (সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি ও আদব)

জিকির একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত, তাই এটি মনগড়া তরিকায় না করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো পদ্ধতিতে আদায় করা আবশ্যক:

  • বিনম্র ও অনুচ্চ কণ্ঠে জিকির:
    জিকির করার সময় অহেতুক চিৎকার-চেঁচামেচি বা ঢাক-ঢোল বাজানো নিষিদ্ধ। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
    “আর তোমার রবকে স্মরণ করো মনে মনে, বিনয় ও ভীতির সাথে এবং অনুচ্চ স্বরে, সকালে ও সন্ধ্যায়; আর তুমি উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”
    — পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২০৫
  • অর্থ ও ভাবের প্রতি মনোযোগ দেওয়া:
    তোতাপাখির মতো কেবল শব্দ উচ্চারণ না করে, যে বাক্যটি পাঠ করা হচ্ছে তার অর্থের প্রতি ধ্যান রাখা। ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার সময় আল্লাহর পবিত্রতা এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সময় তাঁর দেওয়া নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা অন্তরে অনুভব করা।
  • ডান হাতের আঙুলের গিঁটে গণনা করা:
    নবীজি ﷺ সর্বদা তাঁর ডান হাতের আঙুল দিয়ে তসবিহ গণনা করতেন (আবু দাউদ: ৫০৪০)। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা আঙুলের গিঁট দিয়ে গণনা করো, কেননা এগুলোকে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হবে এবং তারা কথা বলবে।” (জামে তিরমিযী: ৩৫৮৩)।
  • বিদআতি সুর ও ভঙ্গি বর্জন:
    নাচানাচি, গোল হয়ে শরীর দোলানো বা অদ্ভুত সুরে কোনো নাম উচ্চারণ করা সুন্নাহবিরোধী। সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত গাম্ভীর্য ও তাকওয়ার সাথে নিঃশব্দে বা মৃদুস্বরে জিকির করতেন।

৫. দৈনন্দিন জীবনের সেরা কিছু মাসনূন জিকির

সহীহ হাদিসে বর্ণিত কয়েকটি শ্রেষ্ঠ জিকির যা নিয়মিত অভ্যাসে রাখা উচিত:

  • আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় চারটি বাক্য:
    “সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার।” (সহীহ মুসলিম: ২১৩৭)।
  • মুখে হালকা কিন্তু মিজানের পাল্লায় অতি ভারী:
    “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আজিম।” (সহীহ বুখারী: ৬৪০৬)।
  • জান্নাতের অমূল্য রত্নভাণ্ডার:
    “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই)। (সহীহ বুখারী: ৬৩৮৪)।
  • ফরজ সালাত-পরবর্তী মাসনূন তাসবিহ:
    প্রত্যেক ফরজ সালাতের সালাম ফিরানোর পর ৩৩ বার سُبْحَانَ اللَّهِ (সুবহানাল্লাহ), ৩৩ বার الْحَمْدُ لِلَّهِ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং ৩৩ বার اللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহু আকবার) পাঠ করে ১০০তম পূর্ণ করতে নিচের দোয়াটি একবার পাঠ করা:

    لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

    উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।”
    অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই; সমস্ত রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই জন্য, আর তিনি প্রতিটি বিষয়ের ওপর সর্বশক্তিমান।”
    ফজিলত: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ সালাতের পর এই আমল করবে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে—যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।”
    — সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯৭

উপসংহার: সার্বক্ষণিক জিকিরের জীবনে পদার্পণ

জিকির কেবল জায়নামাজে বসে করার আমল নয়; পথচলতি অবস্থায়, কাজের ফাঁকে, কিংবা অবসরে জিহ্বাকে আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখা সম্ভব। এক সাহাবী নবীজি ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের নফল বিধান আমার জন্য অনেক বেশি হয়ে গেছে, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যা আমি আঁকড়ে ধরব।” নবীজি ﷺ বললেন: “তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর জিকিরে সিক্ত থাকে।” (জামে তিরমিযী: ৩৩৭৫)।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গাফলতির ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাঁর সার্বক্ষণিক জিকিরকারী ও শোকরগুজার বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: জিকির করার জন্য কি ওজু থাকা বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না, জিকির করার জন্য ওজু থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে ওজু অবস্থায় পবিত্রতার সাথে জিকির করা অধিক উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ।

প্রশ্ন ২: আঙুলে গণনা করে নাকি তসবিহ দানায় জিকির করা উত্তম?

উত্তর: ডান হাতের আঙুলের গিঁট দিয়ে গণনা করে জিকির করা সুন্নাহসম্মত ও সর্বোত্তম। কারণ কিয়ামতের দিন আঙুলগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তারা সাক্ষ্য দেবে।

প্রশ্ন ৩: কেবল মুখে উচ্চারণ করাই কি জিকির?

উত্তর: না। জিকির মূলত তিন স্তরের—জিহ্বার উচ্চারণ (লিসানি), অন্তরের ধ্যান ও ভয় (ক্বলবি) এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্য করা (আমলি)। এই তিনটির সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ জিকির সম্পন্ন হয়।

প্রশ্ন ৪: সব জিকির কি নির্দিষ্ট সংখ্যায় গুণে গুণে করতে হয়?

উত্তর: না, সব জিকির গুণে গুণে করতে হয় না। ইসলামে জিকির মূলত দুই ধরনের—

১. নির্ধারিত সংখ্যার জিকির (মুদাইয়্যাদ): যে আমলগুলোর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো গুণে আদায় করা সুন্নাহ। যেমন—প্রতি ফরজ সালাতের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করা, কিংবা সকাল-সন্ধ্যায় ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ অথবা দিনে ১০০ বার ইস্তিগফার পাঠ করা।

২. অনির্ধারিত সাধারণ জিকির (মুতলাক্ব): কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছাড়াই পথচলা, কাজকর্ম কিংবা অবসরে মন চাইলে যত বেশি সম্ভব সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বা দরুদ পাঠ করা। কুরআনে যে ‘বেশি বেশি জিকির’ করার নির্দেশ এসেছে, তার জন্য কোনো সংখ্যা গণনা বা তসবিহ দানার শর্ত নেই; বরং অন্তর ও জিহ্বাকে সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণে সিক্ত রাখাই আসল উদ্দেশ্য।

আত্মার প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি আপনার আপনজনদের সাথে শেয়ার করুন। জাজাকাল্লাহু খাইরান।