জানাজার নামাজ কী?
জানাজার নামাজের পরিচয় ও গুরুত্ব জানুন।
পড়ুন →মৃত মুসলিমের জন্য জানাজার নামাজের গুরুত্ব, প্রস্তুতি, চার তাকবির, জানাজার দোয়া এবং নামাজের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সহজভাবে জানুন।
কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য যে বিশেষ নামাজ আদায় করা হয়, তাকে জানাজার নামাজ বলা হয়।
জানাজার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া।
জানাজার নামাজে রুকু ও সিজদা নেই। এতে দাঁড়িয়ে চার তাকবির বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
জানাজার নামাজ মুসলিম সমাজের ওপর একটি ‘ফরযে কিফায়া’ বা সামষ্টিক আবশ্যকীয় দায়িত্ব। সমাজের কিছু লোক তা আদায় করলে সবাই দায়মুক্ত হয়, তবে কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হবে। মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এটি অন্যতম মাধ্যম।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিমের জানাজায় অংশগ্রহণ করে এবং জানাজার নামাজ আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকে, সে দুই ‘ক্বীরাত’ সওয়াব নিয়ে ফিরবে। প্রতিটি ক্বীরাত হলো ওহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ। আর যে ব্যক্তি শুধু জানাজার নামাজ পড়ে দাফন সম্পন্ন হওয়ার আগেই ফিরে আসে, সে এক ক্বীরাত সওয়াব লাভ করবে।"
সূত্র: সহিহ বুখারি (হাদিস: ৪৭), সহিহ মুসলিম (হাদিস: ৯৪৫)।
মুসলিম মৃত ব্যক্তির গোসলের শরয়ি বিধান রয়েছে। যোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে তা সম্পন্ন করা হয়।
মৃত ব্যক্তিকে শরিয়তসম্মত কাফন পরানো হয়।
মৃত ব্যক্তিকে জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
মুসলিমদের জানাজার জামাতে অংশগ্রহণ করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা উচিত।
জানাজার নামাজে সাধারণভাবে চার তাকবির বলা হয়।
ইমামের সঙ্গে প্রথম তাকবির বলে নামাজ শুরু করুন। এরপর নির্ধারিত পদ্ধতিতে সানা পাঠ করা হয়।
দ্বিতীয় তাকবির বলার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করা হয়।
তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দোয়া করা হয়।
চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফিরিয়ে জানাজার নামাজ শেষ করা হয়।
অন্তরে মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায়ের নিয়ত করুন এবং ইমামের অনুসরণ করুন।
ইমাম তাকবির বললে তাকবির বলে নামাজ শুরু করুন।
এরপর দোয়া সানা পাঠ করুন।
দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদ শরিফ পাঠ করুন।
তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া করুন।
চতুর্থ তাকবিরের পর ইমামের অনুসরণ করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
প্রথম তাকবির বলে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে হাত বাঁধতে হয় এবং এরপর এই সানাটি পড়তে হয়। সাধারণ নামাজের সানার চেয়ে এতে ‘ওয়া জাল্লা সানা-উকা’ অংশটি অতিরিক্ত পড়া হয়:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَىٰ جَدُّكَ، وَجَلَّ ثَنَاؤُكَ، وَلَا إِلٰهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা'আলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা সানা-উকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা সর্বোচ্চ, আপনার প্রশংসা অতি মহান এবং আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
দ্বিতীয় তাকবির বলার পর হাত না উঠিয়ে দরুদে ইবরাহিম পাঠ করতে হয়—যা সাধারণ নামাজেও তাশাহহুদের পর পড়া হয়:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
তৃতীয় তাকবির বলার পর হাত না উঠিয়ে মৃত ব্যক্তি এবং উপস্থিত সকল মুসলিমের মাগফিরাত ও কল্যাণের জন্য এই প্রসিদ্ধ দোয়াটি পড়তে হয়:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ، اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلَا تُضِلَّنَا بَعْدَهُ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লি হাইয়্যিনা- ওয়া মাইয়্যিতিনা-, ওয়া শা-হিদিনা- ওয়া গ্বায়িবিনা-, ওয়া সগ্বীরিনা- ওয়া কাবীরিনা-, ওয়া যাকারিনা- ওয়া উনছা-না-। আল্লা-হুম্মা মান আহয়াইতাহূ মিন্না- ফাআহয়িহী ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহূ মিন্না- ফাতাওয়াফ্ফাহূ ‘আলাল ঈমান। আল্লা-হুম্মা লা- তাহরিমনা- আজরাহূ ওয়ালা- তুদ্বিল্লানা- বা‘দাহ্।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃতদের, উপস্থিত ও অনুপস্থিতদের, ছোট ও বড়দের এবং পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্য থেকে যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন এবং যাকে মৃত্যু দান করবেন তাকে ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ! এর সওয়াব থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না এবং তার মৃত্যুর পর আমাদের পথভ্রষ্ট করবেন না।
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ (হাদিস: ৩২০১), সুনানে তিরমিজি (হাদিস: ১০২৪), সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস: ১৪৯৮)।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু নিষ্পাপ হওয়ায় তাদের জন্য গুনাহ মাফের দোয়ার পরিবর্তে পিতা-মাতা ও পরিবারের জন্য পারলৌকিক শাফায়াত ও পুণ্যলাভের বিশেষ দোয়া তৃতীয় তাকবিরের পর পাঠ করা হয়।
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطًا، وَاجْعَلْهُ لَنَا أَجْرًا وَذُخْرًا، وَاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا وَمُشَفَّعًا
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাজ‘আলহু লানা- ফারাত্বাঁও, ওয়াজ‘আলহু লানা- আজরাঁও ওয়া জুখরাঁও, ওয়াজ‘আলহু লানা- শা-ফি‘আঁও ওয়া মুশাফ্ফা‘আ-।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি এ শিশুকে আমাদের জন্য অগ্রগামী প্রতিনিধি বানান, তাকে আমাদের জন্য প্রতিদান ও সম্বল বানান এবং তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশকারী হিসেবে কবুল করুন।
اللَّهُمَّ اجْعَلْهَا لَنَا فَرَطًا، وَاجْعَلْهَا لَنَا أَجْرًا وَذُخْرًا، وَاجْعَلْهَا لَنَا شَافِعَةً وَمُشَفَّعَةً
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাজ‘আলহা- লানা- ফারাত্বাঁও, ওয়াজ‘আলহা- লানা- আজরাঁও ওয়া জুখরাঁও, ওয়াজ‘আলহা- লানা- শা-ফি‘আতাঁও ওয়া মুশাফ্ফা‘আহ্।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি এ শিশুকে আমাদের জন্য অগ্রগামী প্রতিনিধি বানান, তাকে আমাদের জন্য প্রতিদান ও সম্বল বানান এবং তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশকারী হিসেবে কবুল করুন।
জানাজার নামাজে মৃত ব্যক্তিকে সামনে রেখে ইমাম দাঁড়ান।
মৃত ব্যক্তি পুরুষ না নারী—তার ওপর ইমামের অবস্থানের বিষয়ে হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে এবং ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয় মসজিদের নির্ভরযোগ্য ইমাম যে পদ্ধতিতে জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন, জামাতের স্বার্থে তার অনুসরণ করুন।
জানাজার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয় এবং মুসল্লিরা ইমামের পেছনে কাতারে দাঁড়ান।
কাতার সোজা রাখা এবং মুসল্লিদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা উচিত।
জানাজার নামাজ সাধারণ নামাজের মতো নয়।
এতে রুকু, সিজদা, বৈঠক ও কিরাআতের সাধারণ কাঠামো নেই।
দাঁড়িয়ে চার তাকবির বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী কেউ জানাজার নামাজ শুরু হওয়ার পর উপস্থিত হলে তার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে:
কেউ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় তাকবিরের পর উপস্থিত হয়, তবে সে সাথে সাথে তাকবির বলে হাত বাঁধবে না; বরং ইমামের পরবর্তী তাকবির বলার জন্য অপেক্ষা করবে। ইমাম যখন পরবর্তী তাকবির বলবেন, তখন সে তাকবিরে তাহরিমা বেঁধে জামাতে শরিক হবে। তবে ইমাম চতুর্থ তাকবির বলে ফেলার আশঙ্কা থাকলে সাথে সাথে তাকবির বলে শরিক হয়ে যেতে পারে।
ইমাম সালাম ফিরিয়ে ফেললে মাসবূক ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাম ফেরাবে না। খাটিয়া বা লাশ জমিন থেকে উঠানোর আগেই সে দাঁড়িয়ে ধারাবাহিকভাবে তার ছুটে যাওয়া তাকবিরগুলো বলে নেবে।
দেরিতে শরিক হওয়ার কারণে যে কয়টি তাকবির ছুটে গেছে, ইমামের সালামের পর শুধু সেই কয়টি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নেবে। সময়স্বল্পতার কারণে ওই তাকবিরগুলোর মধ্যবর্তী সানা, দরুদ বা দোয়া পড়ার প্রয়োজন নেই; কেবল ধারাবাহিক তাকবিরগুলো বলে ডান ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ সম্পন্ন করবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কেউ এমন সময় পৌঁছায় যখন ইমাম চতুর্থ তাকবির বলে ফেলেছেন কিন্তু এখনো সালাম ফেরাননি, তবে সে তখনই তাকবির বলে দ্রুত জামাতে শরিক হবে। এরপর ইমাম সালাম ফেরালে সে যথারীতি ছুটে যাওয়া তাকবিরগুলো আদায় করে সালাম ফেরাবে।
সূত্র: আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়ায়ে শামী)।
কোনো মুসলিমের মৃত্যু হলে তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা করা উত্তম মুসলিম চরিত্রের অংশ।
শোকাহত পরিবারের ওপর অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
জানাজার নামাজে রুকু ও সিজদা নেই।
জানাজার সময় মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ইবাদতে মনোযোগী থাকুন।
জামাতে ইমামের অনুসরণ করা উচিত।
কাতার সোজা রাখুন এবং মুসল্লিদের জন্য জায়গা তৈরি করুন।
জানাজার মূল উদ্দেশ্যের অন্যতম হলো মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা।
ফিকহি মতভেদকে কেন্দ্র করে জানাজার পরিবেশ নষ্ট করা উচিত নয়।
ঈদের নামাজের নিয়ম, তাকবির ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ জানুন।
বিস্তারিত দেখুন →জামাতের নিয়ম ও ইমামের অনুসরণ সম্পর্কে জানুন।
বিস্তারিত দেখুন →নামাজে পড়ার প্রয়োজনীয় দোয়া ও সূরা শিখুন।
বিস্তারিত দেখুন →