তাহাজ্জুদের নামাজ

তাহাজ্জুদের নামাজের ফজিলত, সময়, রাকাআত, দুই রাকাআত করে আদায়ের পদ্ধতি, কিরাআত ও দোয়ার নিয়ম সহজভাবে জানুন।

এই পেজে যা জানবেন

তাহাজ্জুদ কী?

তাহাজ্জুদের নামাজের পরিচয় ও গুরুত্ব জানুন।

পড়ুন →

তাহাজ্জুদের সময়

কখন তাহাজ্জুদ পড়বেন এবং রাতের কোন সময় উত্তম।

পড়ুন →

নামাজের পদ্ধতি

দুই রাকাআত করে তাহাজ্জুদ কীভাবে আদায় করবেন।

পড়ুন →

তাহাজ্জুদের দোয়া

তাহাজ্জুদের পর দোয়া ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব জানুন।

পড়ুন →

তাহাজ্জুদের নামাজ কী?

রাতের বেলায় ঘুম থেকে উঠে যে নফল নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়।

এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নফল ইবাদত।

মনে রাখুন

তাহাজ্জুদ আদায়ের জন্য রাতের কিছু সময় ঘুমিয়ে উঠে নামাজ পড়া উত্তম।

তাহাজ্জুদের ফজিলত

তাহাজ্জুদ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রাতের ইবাদত ও কিয়ামের ব্যাপারে কুরআনে প্রশংসা করেছেন।

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ

অর্থ: আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন— এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত।

সূত্র: সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭৯

তাহাজ্জুদের নামাজের সময়

এশার নামাজের পর থেকে ফজরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের নফল নামাজ আদায় করা যায়।

সর্বোত্তম সময়

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময়।

যে ব্যক্তি শেষ রাতে উঠতে পারবেন বলে আশা করেন, তার জন্য শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা উত্তম।

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ কীভাবে বুঝবেন?

মাগরিব থেকে ফজরের সময় পর্যন্ত রাতের মোট সময়কে তিন ভাগ করলে শেষ ভাগটি হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।

উদাহরণ:

যদি মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত রাতের দৈর্ঘ্য ৯ ঘণ্টা হয়, তাহলে ৩ ঘণ্টা করে তিন ভাগ হবে। শেষ ৩ ঘণ্টা হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।

তাহাজ্জুদ কত রাকাআত?

তাহাজ্জুদের জন্য নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন রাকাআত নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন ফিকহি আলোচনা রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রাতের নামাজের ব্যাপারে সহিহ হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়।

সাধারণভাবে দুই রাকাআত করে নফল নামাজ আদায় করা হয়। কেউ দুই, চার, ছয়, আট বা সামর্থ্য অনুযায়ী আরও বেশি নফল নামাজ আদায় করতে পারেন।

নির্দিষ্ট একটি সংখ্যাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক মনে করা ঠিক নয়।

তাহাজ্জুদের নিয়ত

নফল নামাজের জন্য মূল বিষয় হলো অন্তরের নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের ইচ্ছা করলেই নিয়ত হয়ে যায়।

নিয়ত মুখে আরবি ভাষায় উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। অন্তরের ইচ্ছাই নিয়ত।

দুই রাকাআত তাহাজ্জুদের পদ্ধতি

ধাপ ১ — ঘুম থেকে উঠুন

রাতের শেষভাগে ঘুম থেকে উঠে ওযু করে নামাজের প্রস্তুতি নিন।

ধাপ ২ — কিবলামুখী হন

পবিত্র হয়ে কিবলামুখী দাঁড়ান এবং অন্তরে তাহাজ্জুদের নিয়ত করুন।

ধাপ ৩ — তাকবিরে তাহরিমা

আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করুন।

ধাপ ৪ — কিরাআত

সানা, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা এবং কুরআনের অন্য অংশ পাঠ করুন।

ধাপ ৫ — রুকু ও সিজদা

স্বাভাবিক নিয়মে রুকু, দুই সিজদা ও অন্যান্য আমল সম্পন্ন করুন।

ধাপ ৬ — দ্বিতীয় রাকাআত

দ্বিতীয় রাকাআতেও সূরা ফাতিহা ও কুরআনের অংশ পাঠ করে রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করুন।

ধাপ ৭ — তাশাহহুদ ও সালাম

শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ে ডানে-বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।

তাহাজ্জুদের কিরাআত

তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ কিরাআত করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমল থেকে জানা যায়।

তবে সবার জন্য দীর্ঘ কিরাআত করা আবশ্যক নয়।

আপনি যতটুকু কুরআন সুন্দরভাবে ও শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন, ততটুকু পড়ুন।

তাহাজ্জুদের পর দোয়া

রাতের শেষভাগ দোয়া ও ইস্তিগফারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।

নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা, হেদায়াত, পরিবার, রিজিক, ঈমান ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা যায়।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।

সূত্র: সূরা আল-বাকারা, ২:২০১

শেষ রাতে ইস্তিগফার

আল্লাহ তাআলা কুরআনে মুত্তাকিদের গুণাবলির মধ্যে শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনার কথা উল্লেখ করেছেন।

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অর্থ: এবং তারা শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।

সূত্র: সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৮

তাহাজ্জুদের সঙ্গে বিতর

রাতের নামাজের শেষে বিতর আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।

যে ব্যক্তি মনে করেন তিনি রাতের শেষভাগে উঠতে পারবেন, তিনি বিতর শেষ রাতে পড়তে পারেন।

আর যদি শেষ রাতে ওঠার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করে নেওয়া যায়।

বিতরের রাকাআত ও পদ্ধতিতে ফিকহি মাজহাবভেদে পার্থক্য রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রাতের নামাজ

আয়িশা (রাঃ) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রাতের নামাজ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়।

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে তাঁর রাতের নামাজ সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা রয়েছে।

তাই তাহাজ্জুদ আদায়ের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার চেষ্টা করা উচিত।

নারীদের তাহাজ্জুদের নামাজ

তাহাজ্জুদের নামাজ পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই নফল ইবাদত।

নারী ঘরে নিজের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারেন।

ইবাদতের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন।

তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে না পারলে

কেউ তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে উঠতে না পারলে তার ওপর কোনো গুনাহ নেই, কারণ এটি নফল ইবাদত।

তবে নিয়মিত তাহাজ্জুদের অভ্যাস তৈরি করতে ঘুমানোর আগে অ্যালার্ম দেওয়া, তাড়াতাড়ি ঘুমানো এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উপকারী।

নিয়মিত তাহাজ্জুদের অভ্যাস করার উপায়

আগে ঘুমান

রাত জাগার অভ্যাস কমিয়ে সময়মতো ঘুমানোর চেষ্টা করুন।

অ্যালার্ম দিন

ফজরের কিছু আগে অ্যালার্ম দিয়ে রাখুন।

অল্প দিয়ে শুরু করুন

শুরুতে দুই রাকাআত দিয়ে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করুন।

দোয়া করুন

আল্লাহর কাছে রাতের ইবাদতের তাওফিক চান।

গুনাহ থেকে বাঁচুন

আল্লাহর আনুগত্যের জীবন রাতের ইবাদতের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে।

ধারাবাহিকতা রাখুন

বেশি পড়ে হঠাৎ বন্ধ করার চেয়ে অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা উত্তম।

তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুল

নির্দিষ্ট রাকাআত বাধ্যতামূলক মনে করা

তাহাজ্জুদের নফল নামাজের রাকাআত নিয়ে ফিকহি আলোচনা রয়েছে।

নামাজকে কষ্টকর করা

নিজের সামর্থ্যের বাইরে দীর্ঘ ইবাদত করে পরে সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

লোক দেখানো

তাহাজ্জুদসহ সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত।

ফজরের নামাজ নষ্ট করা

তাহাজ্জুদের কারণে যেন ফজরের ফরজ নামাজ কোনোভাবেই ছুটে না যায়।

দোয়া বাদ দেওয়া

রাতের ইবাদতের সময় আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করুন।

অন্যকে ছোট করা

তাহাজ্জুদ পড়তে না পারা ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়।

তাহাজ্জুদের সহজ চেকলিস্ট

  1. এশার নামাজ আদায় করুন।
  2. সময়মতো ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
  3. রাতের শেষভাগে অ্যালার্ম দিয়ে উঠুন।
  4. ঘুম থেকে উঠে ওযু করুন।
  5. কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান।
  6. অন্তরে তাহাজ্জুদের নিয়ত করুন।
  7. দুই রাকাআত করে নফল নামাজ আদায় করুন।
  8. সামর্থ্য অনুযায়ী কিরাআত করুন।
  9. নামাজ শেষে ইস্তিগফার ও দোয়া করুন।
  10. ফজরের নামাজের জন্য প্রস্তুত থাকুন।

সংক্ষেপে মনে রাখুন

  1. তাহাজ্জুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ।
  2. রাতের শেষ তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময়।
  3. দুই রাকাআত করে নামাজ আদায় করা যায়।
  4. নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিরাআত করা যায়।
  5. রাতের শেষভাগে দোয়া ও ইস্তিগফারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
  6. বিতর রাতের নামাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  7. তাহাজ্জুদের কারণে যেন ফজরের ফরজ নামাজ নষ্ট না হয়।

নামাজ শিক্ষা — আরও পড়ুন