অজু ও পবিত্রতা

নামাজের জন্য পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম অজু। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে অজুর সঠিক পদ্ধতি ধাপে ধাপে শিখুন।

অজু কী?

অজু হলো নির্দিষ্ট অঙ্গগুলো শরিয়তসম্মতভাবে পানি দিয়ে ধৌত ও মাসেহ করার মাধ্যমে নামাজসহ নির্দিষ্ট ইবাদতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা।

নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের আগে পবিত্রতা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে অজুর অঙ্গগুলো ধৌত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

কুরআনে অজুর নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ
অর্থ: হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াতে চাও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো।

— সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৬

অজুর প্রধান ফরজ

কুরআনের সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৬-এ অজুর মৌলিক অঙ্গগুলোর নির্দেশ এসেছে।

মুখমণ্ডল ধোয়া

সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধুতে হবে।

দুই হাত ধোয়া

কনুইসহ দুই হাত ধুতে হবে।

মাথা মাসেহ

মাথা মাসেহ করতে হবে।

দুই পা ধোয়া

টাখনুসহ দুই পা ধুতে হবে।

অজুর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অজুর পদ্ধতি থেকে বিভিন্ন সুন্নাহ আমাদের জানা যায়।

  • অজুর শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া।
  • দুই হাত কবজি পর্যন্ত ধোয়া।
  • কুলি করা।
  • নাকে পানি দেওয়া।
  • মুখ ভালোভাবে ধোয়া।
  • হাত কনুইসহ ধোয়া।
  • মাথা মাসেহ করা।
  • কান মাসেহ করা।
  • পা টাখনুসহ ভালোভাবে ধোয়া।
  • অজুর অঙ্গগুলো ধারাবাহিকভাবে করা।

ধাপে ধাপে অজু করার পদ্ধতি

নিচের ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে অজু করতে পারেন।

অজুর নিয়ত

অজু করার জন্য অন্তরে পবিত্রতা অর্জনের সংকল্প করুন। নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছা।

বিসমিল্লাহ বলা

অজু শুরু করার সময় বলুন:

بِسْمِ اللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে।

দুই হাত ধোয়া

দুই হাত কবজি পর্যন্ত ভালোভাবে ধুয়ে নিন। আঙুলের ফাঁকগুলোও পরিষ্কার করুন।

কুলি করা

ডান হাত দিয়ে পানি নিয়ে ভালোভাবে কুলি করুন এবং মুখের ভেতর পরিষ্কার করুন।

নাকে পানি দেওয়া

ডান হাত দিয়ে পানি নিয়ে নাকে দিন এবং বাম হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করুন।

মুখমণ্ডল ধোয়া

কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধুয়ে নিন।

দাড়ি থাকলে তার ব্যাপারেও সুন্নাহ অনুযায়ী পানি পৌঁছানোর বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

ডান হাত ধোয়া

ডান হাত কনুইসহ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। আঙুলের ফাঁকেও পানি পৌঁছান।

বাম হাত ধোয়া

একইভাবে বাম হাত কনুইসহ ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

মাথা মাসেহ করা

ভেজা হাত দিয়ে মাথা মাসেহ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মাসেহের পদ্ধতি সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

কান মাসেহ করা

মাথা মাসেহের সঙ্গে কান মাসেহ করার বর্ণনাও হাদিসে এসেছে।

ডান পা ধোয়া

ডান পা টাখনুসহ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। পায়ের আঙুলের ফাঁকে পানি পৌঁছান।

বাম পা ধোয়া

বাম পা টাখনুসহ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। পায়ের আঙুলের ফাঁকেও পানি পৌঁছান।

অজুর পরের দোয়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ অজুর পর তাওহিদের সাক্ষ্য পাঠ করতে বলেছেন।

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।

কোন কোন কারণে অজু নষ্ট হয়?

সাধারণভাবে যেসব কারণে অজু নষ্ট হওয়ার কথা ফিকহের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পেশাব-পায়খানা

প্রস্রাব বা পায়খানা করলে অজু নষ্ট হয়।

বায়ু নির্গত হওয়া

পায়ুপথ দিয়ে বায়ু বের হলে অজু নষ্ট হয়।

গভীর ঘুম

এমন ঘুম যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তা অজু নষ্টের কারণ হতে পারে।

অন্যান্য কারণ

বিভিন্ন ফিকহি মত অনুযায়ী আরও কিছু বিষয় অজু নষ্টের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফিকহি মতভেদের বিষয়

অজু ভঙ্গের কিছু বিষয় নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যেমন স্পর্শ, রক্তপাত, বমি ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবে ভিন্ন মত পাওয়া যায়। তাই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটলে নিজের অনুসৃত নির্ভরযোগ্য আলেম বা মাজহাবের নির্দেশনা অনুসরণ করা উত্তম।

অজুর সময় সাধারণ ভুল

  1. অজুর অঙ্গগুলোতে পানি ভালোভাবে না পৌঁছানো।
  2. পায়ের আঙুলের ফাঁকে পানি না পৌঁছানো।
  3. কনুই বা টাখনু ভালোভাবে না ধোয়া।
  4. অজু করার সময় অপ্রয়োজনীয় অপচয় করা।
  5. অজুর সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা।
  6. অজুর সুন্নাহগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা।

অজুতে পানি অপচয় করবেন না

অজুর ক্ষেত্রে পরিমিত পানি ব্যবহার করা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ অল্প পানি দিয়েও অজু করতেন বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

অজুর উদ্দেশ্য হলো শরিয়তসম্মতভাবে পবিত্রতা অর্জন করা; অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা নয়।

নামাজ শিক্ষা থেকে আরও শিখুন

নামাজের প্রস্তুতি

নামাজের আগে পোশাক, স্থান, কিবলা ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পর্কে জানুন।

প্রস্তুতি দেখুন →

দুই রাকাআত নামাজ

তাকবির থেকে সালাম পর্যন্ত দুই রাকাআত নামাজের পূর্ণ পদ্ধতি শিখুন।

নামাজের পদ্ধতি →

নামাজের দোয়া ও সূরা

নামাজে পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও সূরাগুলো শিখুন।

দোয়া ও সূরা →