দুই রাকাআত নামাজের পূর্ণ পদ্ধতি

তাকবিরে তাহরিমা থেকে সালাম পর্যন্ত দুই রাকাআত নামাজের ধাপগুলো সহজভাবে শিখুন।

গুরুত্বপূর্ণ কথা

নামাজের কিছু আমল ও অঙ্গভঙ্গির ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে ফিকহি মতভেদ রয়েছে। তাই মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একে অপরকে ভুল বলা উচিত নয়। এখানে নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে নামাজের মৌলিক পদ্ধতিটি সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

দুই রাকাআত নামাজের ধাপগুলো

নিচের ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করুন।

নিয়ত

কোন নামাজ পড়ছেন তা মনে স্থির করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামাজ শুরু করুন।

তাকবির

“আল্লাহু আকবার” বলে নামাজ শুরু করুন।

কিয়াম ও কিরাআত

দাঁড়িয়ে সানা, সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়ুন।

রুকু

তাকবির বলে রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবিহ পড়ুন।

সিজদা

রুকু থেকে উঠে দুইবার সিজদা করুন।

শেষ বৈঠক

দ্বিতীয় রাকাআতের পর তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ে সালাম ফিরান।

ধাপে ধাপে দুই রাকাআত নামাজ

প্রতিটি ধাপ মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

১. নামাজের জন্য প্রস্তুতি ও নিয়ত

অজু করে পবিত্র অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। শরীর, পোশাক ও নামাজের স্থান পবিত্র রাখুন। যে নামাজ আদায় করবেন তা অন্তরে নির্ধারণ করুন।

নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছা ও সংকল্প। নির্দিষ্ট কোনো আরবি বাক্য উচ্চারণ করাকে নিয়তের শর্ত মনে করা উচিত নয়।

২. তাকবিরে তাহরিমা

কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে “আল্লাহু আকবার” বলে নামাজ শুরু করুন। এরপর হাত বাঁধুন।

اللهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।

৩. সানা পড়া

নামাজের শুরুতে সানা পড়া সুন্নাহ।

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা‘আলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র, আপনারই প্রশংসা। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা অতি মহান এবং আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

৪. আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ

এরপর শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে বিসমিল্লাহ পড়ুন।

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

৫. সূরা ফাতিহা পড়া

সূরা ফাতিহা নামাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিরাআত। ধীরে ও মনোযোগের সঙ্গে পড়ুন।

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আর-রাহমানির রাহিম। মালিকি ইয়াওমিদ্দিন। ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন। ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম। সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দল্লিন।

সূরা ফাতিহা শেষ করার পর “আমিন” বলা সুন্নাহ।

৬. অন্য একটি সূরা বা কিরাআত

সূরা ফাতিহার পর কুরআনের কোনো সূরা অথবা কয়েকটি আয়াত পড়ুন।

উদাহরণ হিসেবে সূরা ইখলাস পড়া যেতে পারে।

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
اللَّهُ الصَّمَدُ
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণ: কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ। ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।

৭. রুকু

“আল্লাহু আকবার” বলে রুকুতে যান। রুকুতে পিঠ যথাসম্ভব সোজা রাখুন এবং স্থিরভাবে রুকু করুন।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আযিম।
অর্থ: আমার মহান রব পবিত্র।

৮. রুকু থেকে ওঠা

রুকু থেকে উঠতে “সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলুন। সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে “রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ” বলুন।

سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ।
রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ।

৯. প্রথম সিজদা

“আল্লাহু আকবার” বলে সিজদায় যান। সিজদায় কপাল ও নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুল মাটিতে থাকবে।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা।
অর্থ: আমার সর্বোচ্চ রব পবিত্র।

১০. দুই সিজদার মাঝখানে বসা

প্রথম সিজদা থেকে উঠে স্থিরভাবে বসুন। এরপর দ্বিতীয় সিজদা করুন।

رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: রব্বিগফির লি।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন।

১১. দ্বিতীয় সিজদা

আবার “আল্লাহু আকবার” বলে দ্বিতীয় সিজদায় যান এবং সিজদার তাসবিহ পড়ুন।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা।

১২. দ্বিতীয় রাকাআতের জন্য দাঁড়ানো

দ্বিতীয় সিজদা শেষ করে “আল্লাহু আকবার” বলে দ্বিতীয় রাকাআতের জন্য দাঁড়িয়ে যান।

দ্বিতীয় রাকাআতে আবার সূরা ফাতিহা এবং এরপর অন্য একটি সূরা বা কিরাআত পড়ুন।

১৩. দ্বিতীয় রাকাআতের রুকু ও সিজদা

প্রথম রাকাআতের মতোই দ্বিতীয় রাকাআতে কিরাআত শেষ করে রুকু করুন, রুকু থেকে উঠুন, এরপর দুইটি সিজদা করুন।

দ্বিতীয় সিজদা শেষ হলে শেষ বৈঠকের জন্য বসুন।

১৪. তাশাহহুদ পড়া

শেষ বৈঠকে বসে তাশাহহুদ পড়ুন।

التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্তাইয়্যিবাত। আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।

১৫. দরুদ ইবরাহিম

তাশাহহুদের পর নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করুন।

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

১৬. দোয়া করা

দরুদের পর আল্লাহর কাছে বিভিন্ন মাসনূন দোয়া করা যায়।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসিহিদ্দাজ্জাল।

১৭. সালাম ফিরানো

ডান দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাম দিন, এরপর বাম দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাম দিন।

السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
অর্থ: আপনাদের ওপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।

নামাজ শেখার মূল নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে নামাজ পড়।”

— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩১

দলিলের গুরুত্ব

নামাজের পদ্ধতি শেখার ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত। কোনো একটি আমল নিয়ে মতভেদ থাকলে তা যাচাই করে বুঝে আমল করা উচিত।

আরও শিখুন

অজু ও পবিত্রতা

নামাজের আগে অজু ও পবিত্রতার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানুন।

অজু শিক্ষা →

নামাজের প্রস্তুতি

নামাজের সময়, কিবলা, পোশাক, স্থান ও নিয়ত সম্পর্কে জানুন।

প্রস্তুতি দেখুন →

নামাজের দোয়া ও সূরা

নামাজে পাঠ করা প্রয়োজনীয় দোয়া ও সূরাগুলো শিখুন।

দোয়া ও সূরা →