ইসলাম ধর্মে ফার্স্ট জানুয়ারি পালন করা কি?

ইসলাম ধর্মে ফার্স্ট জানুয়ারি পালন

ফার্স্ট জানুয়ারি বা ইংরেজি নববর্ষ পালন আজ বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মনে প্রশ্ন আসা উচিত— ইসলাম ধর্মে ফার্স্ট জানুয়ারি পালন করা কি জায়েয? কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে সহজ ভাষায় এই বিষয়টি এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ফার্স্ট জানুয়ারি হলো মূলত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন। ঐতিহাসিকভাবে এটি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং খ্রিস্টান সভ্যতার ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আজকাল দেখা যায়, অনেক মুসলিমও এই দিনটি আসার সাথে সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়, রাত বারোটা এক মিনিটে কেক কাটা, ফায়ারওয়ার্কস বা নানা রকম আনন্দ প্রকাশে মেতে ওঠেন।

কিন্তু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একজন মুসলিমের জন্য জীবনে কোনো কাজ বৈধ নাকি অবৈধ— তা নির্ধারিত হয় সরাসরি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। তাই এই আধুনিক কালচারে গা ভাসানোর আগে আমাদের জানতে হবে ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে।

ইসলামে উৎসব বা ঈদের সংখ্যা কতটি?

ইসলাম ধর্মে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্টভাবে মাত্র দুটি বাৎসরিক উৎসব বা ঈদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর বাইরে নতুন কোনো দিনকে ধর্মীয় বা সামাজিকভাবে উৎসব বানানোর সুযোগ রাখা হয়নি।

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

“রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় আগমন করে দেখলেন, লোকেরা দুটি নির্দিষ্ট দিনে ক্রীড়া-কৌতুক ও আনন্দ প্রকাশ করে। তিনি বললেন, ‘এই দুটি দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদের জন্য আরও উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।’”
— সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪

এই সহীহ হাদিসটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মুসলমানদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও উৎসব রয়েছে। তাই অন্য কোনো জাতির উৎসব ধার করে এনে পালন করার কোনো অনুমতি ইসলামে নেই।

অমুসলিমদের উৎসব অনুকরণ সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি

যেহেতু ফার্স্ট জানুয়ারি বা থার্টি ফার্স্ট নাইট মূলত অমুসলিম সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে আগে থেকেই স্পষ্ট সতর্ক করে গেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:- “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ বা সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।”
— সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১

ইসলামী গবেষক ও আলেমগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন— অনুকরণ বলতে এখানে মূলত অন্য জাতির ধর্মীয় সংস্কৃতি, উৎসবমূলক রীতি এবং তাদের কৃষ্টি-কালচার অন্ধভাবে অনুসরণ করাকে বোঝানো হয়েছে। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন লাইফস্টাইল এবং আনন্দ প্রকাশ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মার্জিত।

ফার্স্ট জানুয়ারির ঐতিহাসিক পরিচয়

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাবো ফার্স্ট জানুয়ারির সূচনা রোমান পৌত্তলিকদের 'জানুস' (Janus) নামক দেবতার পূজা ও খ্রিস্টান ক্যালেন্ডারের সংস্কারের সাথে জড়িত। এর সাথে ইসলামী ইতিহাস, হিজরি সন কিংবা কোনো নবী–রাসূলের আদর্শের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

তাই বাহ্যিকভাবে একে ধর্মনিরপেক্ষ বা গ্লোবাল উৎসব বলা হলেও, এর ভেতরের মূল চেতনাটি মুসলিমদের সংস্কৃতির সাথে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে নতুন বছরকে কীভাবে দেখা উচিত?

ইসলাম সময় বা বছরের পরিবর্তনকে ডিজে পার্টি, কনসার্ট বা আতশবাজি ফুটিয়ে উদযাপনের বিষয় বানায়নি। বরং সময়ের এই পরিবর্তনকে একজন মুমিনের জীবনে 'আত্মসমালোচনা' এবং পূর্বের আমলের হিসাব নেওয়ার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।

নতুন বছর যখনই আসে, তখন আনন্দ করার পরিবর্তে একজন সচেতন মুসলিমের মনে এই চিন্তাগুলো আসা উচিত:

  • আমি গত একটি বছর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কী কী নেক আমল করেছি?
  • আমার জীবন থেকে ঝরে যাওয়া দিনগুলোতে কতগুলো গুনাহের কাজ হয়ে গেছে?
  • মৃত্যুর দিকে আমি আরও এক বছর এগিয়ে গেলাম, আখিরাতের জন্য আমার প্রস্তুতি কতটুকু?

এইভাবে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং আগামী দিনের জন্য আমল সংশোধনের নিয়ত করাই হলো ইসলামের আসল শিক্ষা।

থার্টি ফার্স্ট নাইট ও বর্ষবরণে একজন মুসলিমের করণীয়

নিজেকে ফিতনা থেকে মুক্ত রাখতে এবং ঈমান রক্ষা করতে একজন মুমিন ব্যক্তি নিচের বিষয়গুলো মেনে চলবেন:

  • ফার্স্ট জানুয়ারিকে নিজের উৎসব মনে করে কোনো প্রকার আনন্দ প্রকাশ বা পার্টি করবে না।
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় বা বাস্তবে একে অপরকে 'হ্যাপি নিউ ইয়ার' বা ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো থেকে বিরত থাকবে।
  • এই রাতে চারদিকে যে সমস্ত অশ্লীলতা, গান-বাজনা, মদ ও বেহায়াপনা চলে, তা থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখবে।
  • সময়ের গুরুত্ব বুঝে আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি ইস্তিগফার এবং নিজের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করবে।

উপসংহার

পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের অকাট্য দলিলের আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়— ইসলাম ধর্মে ফার্স্ট জানুয়ারি বা ইংরেজি নববর্ষ পালন ও উদযাপন করা কোনোভাবেই জায়েয নয়।

আমাদের মনে রাখা উচিত, একজন মুসলিমের প্রতিটি ইবাদত, আনন্দ এবং উৎসব পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-এর নির্দেশিত পথ অনুযায়ী। আর এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত শান্তি ও সফলতা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অন্য সংস্কৃতির ফিতনা থেকে নিজেদের ঈমান ও আমলকে হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।